
স্টাফ রিপোর্টার
টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, কমিশন বাণিজ্য ও শতকোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ; সম্পদের তথ্য সংগ্রহে দুদক, অভিযোগ অস্বীকার বা ব্যাখ্যা মেলেনি
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরে (সওজ) টেন্ডার প্রক্রিয়া, ঠিকাদারি সিন্ডিকেট ও কমিশন বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান। তার বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়া, কমিশনের বিনিময়ে প্রকল্প অনুমোদন এবং জ্ঞাত আয়ের বাইরে বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
অভিযোগকারী মো. আব্দুল হান্নান নিজেকে সওজের একজন নিয়মিত ঠিকাদার হিসেবে পরিচয় দিয়ে অভিযোগে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের সময় মো. মনিরুজ্জামান একটি প্রভাবশালী ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তার প্রভাবেই টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বিল-ভাউচার অনুমোদন, কমিশন আদায় এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, কক্সবাজার সড়ক বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী থাকাকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেখিয়ে প্রায় ১৫০ কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম করা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, অনেক ক্ষেত্রে কাজ সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
রাজশাহী জোনে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে নিয়ে সিন্ডিকেট গঠন এবং কমিশন ছাড়া কোনো ঠিকাদারকে কাজ না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে মুন্সিগঞ্জ সড়ক বিভাগে তার দায়িত্বকাল নিয়েও। সেখানে সড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও কাজের মান নিম্নমানের হওয়ায় বর্ষা শুরুর আগেই অনেক সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
রংপুর জোনে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কয়েকটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি ক্রয় বিধিমালা লঙ্ঘন করে দরপত্রের শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশাসনিক, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত অনুমোদনের ক্ষেত্রে ৫ থেকে ৮ শতাংশ কমিশন ছাড়া কোনো ফাইলে স্বাক্ষর করা হয় না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সওজের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেন, কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তার সিন্ডিকেটের কারণে অধিদপ্তরের স্বচ্ছতা ও ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে টেন্ডার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তার করে একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সক্রিয় রয়েছে।
এদিকে, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় গত ১৫ বছরে সওজের উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ অপচয় বা দুর্নীতির মাধ্যমে লোপাট হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়, দরপত্র, বিল অনুমোদন ও লাইসেন্স ব্যবস্থাপনায় ঠিকাদার, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের যোগসাজশে অনিয়ম সংঘটিত হওয়ার ঝুঁকি দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সওজের ক্রয় প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক সিন্ডিকেটের বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, মো. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ কমিশনে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তার নামে-বেনামে থাকা সম্পদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগের পর কমিশনের বিধি অনুযায়ী পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালিত হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে মো. মনিরুজ্জামান কোনো বক্তব্য দেননি। প্রথমে ফোন কেটে দেন, পরে কথা বলবেন বলে জানালেও আর সাড়া দেননি এবং পরবর্তীতে প্রতিবেদকের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর ব্লক করে দেন। অন্য নম্বর থেকেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া সওজের প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ মঈনুল হাসানের সঙ্গে কার্যালয় ও মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।