
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া—সরু রাস্তা, ঘনবসতি আর অপর্যাপ্ত নাগরিক অবকাঠামোর কারণে যেখানে একটি জরুরি পরিস্থিতিতে ফায়ার সার্ভিস বা অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানোই কঠিন। সেই এলাকায় একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ ঘিরে উঠছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি উপেক্ষা করে গড়ে উঠছে বড় বড় ভবন।
গেন্ডারিয়ার ১৪ সতীশ সরকার রোডের একটি নির্মাণাধীন ভবনকে ঘিরে এমনই গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ভবনটি যেন ‘পুরান ঢাকার আইফেল টাওয়ার’। অভিযোগ রয়েছে, ১০ কাঠা জমির ওপর ১৩ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন নেওয়া হলেও পরবর্তীতে পাশের আরও দুই কাঠা জমি যুক্ত করে মোট ১২ কাঠা জায়গায় নতুন অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অনুমোদিত উচ্চতার চেয়েও বেশি তলা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আলম ভিলা নামের ভবনটি। ভবনটির মালিক মো. রুহুল আমিন, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ওয়ান ম্যান রিয়েল এস্টেট লিমিটেড।
১০ কাঠার অনুমোদন, নির্মাণ ১২ কাঠায়
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ১৪ সতীশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকার ১০ কাঠা জমির ওপর বি+জি+১২ কাঠামোর ১৩ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন পায় ওয়ান ম্যান রিয়েল এস্টেট লিমিটেড।
অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তীতে ভবনসংলগ্ন আরও দুই কাঠা জমি কেনা হলেও ওই অতিরিক্ত জমি অন্তর্ভুক্ত করে নতুন করে অনুমোদিত নকশা নেওয়া হয়নি। বরং ১০ কাঠার অনুমোদিত নকশার ভিত্তিতেই ১২ কাঠা জমিতে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়।
এতে প্রশ্ন উঠেছে—জমির আয়তন পরিবর্তনের পর সংশোধিত নকশা ও অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না?
১৩ তলার অনুমোদনে ১৫ তলা?
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদিত নকশায় ভবনের উচ্চতা ১৩ তলা হলেও বর্তমানে ভবনটিতে ১৫ তলা নির্মাণের কাজ চলছে।
শুধু তলার সংখ্যাই নয়, ভবনের চারপাশে প্রয়োজনীয় জায়গা না রাখা, অনুমোদিত FAR বা Floor Area Ratio অনুসরণ না করা এবং ভবনের ভেতরে পর্যাপ্ত VOID/খোলা জায়গা না রাখার অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ সত্য হলে তা শুধু নকশা লঙ্ঘনের বিষয় নয়; ভবনের নিরাপত্তা, আলো-বাতাস চলাচল, অগ্নিনিরাপত্তা এবং আশপাশের ভবনের ওপর সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়ও সামনে আসে।
মোবাইল কোর্টে জরিমানা, ভাঙা হয়েছিল অতিরিক্ত অংশ
রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ভবনটিতে অভিযান চালিয়ে অতিরিক্ত অংশ ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ভবন মালিককে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং বিদ্যুতের মিটার সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
রাজউক জোন-৭-এর অথরাইজড অফিসার মো. ইলিয়াছ বলেন, পরবর্তীতে মালিকপক্ষ আদালতে রিট করে মিটার ফেরত নিয়ে আবার নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।
তার ভাষ্য, রিটের বিরুদ্ধে করণীয় নির্ধারণে প্রয়োজনীয় নথিপত্র রাজউকের আইন শাখায় পাঠানো হয়েছে। আদালতের আদেশের পর বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
‘কোর্টের আদেশ’—রাজউকের দায় কি শেষ?
রাজউক জোন-৭-এর পরিচালক মো. মাইনুল আবেদিনের বক্তব্যও একই ধরনের। তিনি বলেন, আদালতের আদেশ থাকায় এখন আইনি প্রক্রিয়ায় এগোনো ছাড়া তাদের করার কিছু নেই।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিদর্শক মো. রাফিউল ইসলাম জানান, আদালতের আদেশের কারণে ফাইলটি আইন শাখায় পাঠানো হয়েছে। তবে ভবনটি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে আগের কর্মকর্তাদের যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এখানেই উঠছে বড় প্রশ্ন—কোনো নির্মাণাধীন ভবনের বিরুদ্ধে রাজউকের অভিযান, জরিমানা ও অতিরিক্ত অংশ অপসারণের পর মালিক আদালতে গেলে রাজউকের তদারকি ও আইনগত পদক্ষেপ কি কেবল ‘ফাইল আইন শাখায় পাঠানো’র মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে?
আদালতের আদেশ নিয়ে নতুন প্রশ্ন
মালিকপক্ষ আদালতে রিট করেছে—এটি তাদের আইনগত অধিকার। তবে সেই রিটের মাধ্যমে আদালত ঠিক কী আদেশ দিয়েছেন, আদেশের পরিধি কী এবং সেটি নির্মাণকাজ, বিদ্যুৎ সংযোগ বা ভবনে বসবাসের অনুমতির ক্ষেত্রে কীভাবে প্রযোজ্য—তা আদালতের সংশ্লিষ্ট আদেশের কপি দেখে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বিশেষ করে, একটি নির্মাণাধীন ভবনে বসবাসের অনুমতি বা ইউটিলিটি সংযোগের বিষয়ে আদালতের আদেশ থাকলে সেটির প্রকৃত অর্থ কী—তা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে রাজউকের আইন শাখার উচিত আদালতের আদেশের পূর্ণাঙ্গ কপি পর্যালোচনা করে স্পষ্ট করা—আদেশটি ঠিক কোন বিষয়ে, কতদিনের জন্য এবং কোন শর্তে প্রযোজ্য। একই সঙ্গে অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের বর্তমান অবস্থা ও আদালতের আদেশের মধ্যে কোনো অসামঞ্জস্য রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।
মালিকের বক্তব্য কী?
ভবনটির মালিক মো. রুহুল আমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি।
তিনি বলেন, বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিট করা হয়েছে, তাই এ বিষয়ে তিনি কথা বলতে চান না। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগকে তিনি মিথ্যা বলে দাবি করেন।
পুরান ঢাকার সংকট আরও গভীর হচ্ছে
গেন্ডারিয়ার এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো স্থাপনা-সংক্রান্ত অভিযোগ নয়; এটি পুরান ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনার বড় সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।
পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকায় রাস্তা সরু, খোলা জায়গা সীমিত এবং অনেক স্থানে পুরোনো ড্রেনেজ ও অবকাঠামোর ওপর অতিরিক্ত জনঘনত্ব তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই এক বা দুই কাঠা জমিতে বহুতল ভবন নির্মাণের প্রবণতা বাড়ছে।
ফলে ভবনের উচ্চতা ও আয়তন বাড়লেও সেই অনুপাতে রাস্তা, পার্কিং, অগ্নিনিরাপত্তা, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়ছে না।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, পুরান ঢাকার সংকট শুধু ভবনের উচ্চতা নিয়ে নয়; মূল সমস্যা হলো অতিরিক্ত ঘনত্ব ও অপর্যাপ্ত অবকাঠামো। সরু রাস্তা, সীমিত খোলা জায়গা এবং দুর্বল নাগরিক অবকাঠামোর মধ্যে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মাণ হলে এলাকার ধারণক্ষমতা দ্রুত অতিক্রম করে।
তাদের মতে, পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক নগর কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে বিশেষায়িত পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন শহরাঞ্চলের জন্য তৈরি সাধারণ বিল্ডিং নীতিমালা হুবহু প্রয়োগ করলেই পুরান ঢাকার সমস্যা সমাধান হবে না।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি
১. ১০ কাঠা জমির ওপর অনুমোদিত নকশা দিয়ে পরবর্তীতে ১২ কাঠা জমিতে নির্মাণ করা হলে সংশোধিত নকশা ও নতুন অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি?
২. ১৩ তলা অনুমোদনের বিপরীতে ১৫ তলা নির্মাণের অভিযোগ সত্য হলে রাজউক কেন কার্যকরভাবে নির্মাণ বন্ধ করতে পারছে না?
৩. ভবনের চারপাশের সেটব্যাক, FAR, VOID এবং অন্যান্য বাধ্যতামূলক শর্ত বাস্তবে কতটুকু মানা হয়েছে?
৪. রাজউকের মোবাইল কোর্টে অতিরিক্ত অংশ ভাঙা ও ৫ লাখ টাকা জরিমানার পর আবার নির্মাণকাজ শুরু হলো কীভাবে?
৫. আদালতের রিটে ঠিক কী আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং সেই আদেশের সঙ্গে ভবন নির্মাণ ও ইউটিলিটি সংযোগের সম্পর্ক কী?
৬. রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আদালতের আদেশের পাশাপাশি অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি আইনগতভাবে মোকাবিলায় কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
৭. ভবনটি সম্পূর্ণ হওয়ার পর অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি উদ্ধার, আলো-বাতাস, পার্কিং ও আশপাশের ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা আছে কি?
শেষ কথা
গেন্ডারিয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একটি বহুতল ভবনের অনুমোদন ও নির্মাণ শুধু জমির মালিকের ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িত আশপাশের শত শত মানুষের নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, নাগরিক সুবিধা এবং নগর পরিকল্পনা।
তাই ‘আদালতে মামলা হয়েছে’—এই যুক্তিতে প্রশাসনিক তদারকি থেমে থাকা উচিত নয়। বরং আদালতের আদেশ যথাযথভাবে মেনে চলার পাশাপাশি অনুমোদিত নকশা বনাম বাস্তব নির্মাণের পূর্ণাঙ্গ কারিগরি যাচাই, সংশ্লিষ্ট নথির পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে শুধু ভবন মালিক নয়—অনুমোদন, পরিদর্শন ও তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত প্রয়োজন। আর অভিযোগগুলো সত্য না হলে রাজউক ও ভবন মালিক—উভয়েরই উচিত নথি প্রকাশ করে বিষয়টি স্পষ্ট করা।
কারণ, পুরান ঢাকার সরু গলিতে আরেকটি ‘আইফেল টাওয়ার’ দাঁড়ানোর আগে প্রশ্নটি শুধু—ভবনটি কত তলা? নয়; প্রশ্ন হলো—জরুরি মুহূর্তে মানুষ বের হবে কোন পথে?