October 29, 2026, 1:01 am
শিরোনাম :
অপরাধ ঢাকতে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি: ফেসবুকে জেসিকার ‘আত্মহত্যার হুমকি’ রেজিস্টারে মিলছে না হিসাব, তাহলে কৃষকের সার যাচ্ছে কোথায়? ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কাল ভোট, কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে নির্বাচনি সরঞ্জাম ‎ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অংশে ডেমরা সেতু সংস্কার কাজের জন্য   ৩ কিলোমিটার জুড়ে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা রূপগঞ্জে লক্ষীপূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে হাজী মাসুমের শুভেচ্ছা বিনিময় পটুয়াখালীতে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সারারাত ধরে পরিষ্কার হলো পরিষ্কার হলো ঢাকা- সিলেট মহাসড়ক কালীগঞ্জে ডাকাতির ঘটনায় মালামাল উদ্ধারসহ -২ ডাকাত গ্রেফতার চৌদ্দগ্রামে আ’লীগের তান্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল পায়রা নদীতে যৌথ অভিযানে সাড়ে ৭ লাখ টাকার জাল জব্দ

ঢাকা কাস্টম হাউসে ৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস, ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ—দুদক-এনবিআরের দ্বারে ব্যবসায়ী; প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

 

রাজধানীর ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ৩৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি, বন্ধ হয়ে যাওয়া বন্ড প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস এবং ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ঢাকা কাস্টম হাউসের প্রিভেন্টিভ শাখার সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা (এআরও) মো. আব্দুর রাকিব এবং রাজস্ব কর্মকর্তা (আরও) ফরিদুজ্জামান।

অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চেয়ে গত ১১ জুন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ১২ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এইচ. এম. ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট লাইসেন্সধারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির।

লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা তিনটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিভিন্ন ধরনের পণ্য খালাসের একটি কথিত প্রক্রিয়া চলেছে। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—এলিয়েন অ্যাপারেলস লিমিটেড, ইউরেনাস অ্যাপারেলস (প্রাইভেট) লিমিটেড এবং কুইক অ্যাপারেলস লিমিটেড।

বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাসের অভিযোগ

অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, তার প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মচারী কথিত এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারার পর তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পরে সংশ্লিষ্ট পণ্য ও চালান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার পর ওই কর্মচারীকে ডেকে পাঠানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, বিষয়টি প্রকাশ না করার জন্য ওই কর্মচারীর কাছে ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। তবে ঘুষ দাবির অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রত্যক্ষ বা লিখিত প্রমাণ রয়েছে, তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি কীভাবে?

অভিযোগে বিভিন্ন বিল অব এন্ট্রির তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামে লেস, ওভেন ফেব্রিক, নিট ফেব্রিক, বাটন, জিপার ও রাবার প্যাচসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, শুধু ইউরেনাস অ্যাপারেলসের নামেই ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ এবং এর আগের বিভিন্ন সময়ে একাধিক বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে ফেব্রিক স্যাম্পল ও ওভেন ফেব্রিক খালাসের তথ্য রয়েছে। একইভাবে কুইক অ্যাপারেলস ও এলিয়েন অ্যাপারেলসের নাম ব্যবহার করেও পণ্য খালাসের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগে সংযুক্ত নথির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, কয়েকটি আমদানির অ্যাসেসড ভ্যালু ৪ কোটি ৩০ লাখ ৪৬ হাজার ৬০৭ টাকা। এর বিপরীতে শুল্ক ফাঁকির হিসাব দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ২৩ লাখ ৯ হাজার ৪৮৬ টাকা। তবে অভিযোগকারীর দাবি, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন চালান ও লেনদেন বিবেচনায় সামগ্রিক রাজস্ব ফাঁকির পরিমাণ ৩৩ কোটি টাকার বেশি।

এখানেই মূল প্রশ্ন—অভিযোগে উল্লেখ করা প্রতিটি বিল অব এন্ট্রি, আমদানিকারক, কুরিয়ার চালান, বন্ড সুবিধা এবং প্রকৃত রাজস্ব হিসাব কি এনবিআরের সংশ্লিষ্ট শাখা যাচাই করেছে?

‘প্রভাবশালী বলয়ের’ অভিযোগ

অভিযোগকারী দাবি করেছেন, এআরও মো. আব্দুর রাকিব কাস্টমস কমিশনারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিএস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে এক ধরনের প্রভাব কাজ করছে। একইভাবে রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামান প্রিভেন্টিভ শাখার ডেপুটি কমিশনার আমিনুলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তিনি প্রভাবশালী বলয়ের সুবিধা পাচ্ছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।

তবে প্রভাবশালী বলয় বা কথিত সিন্ডিকেটের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

দায় কার—সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, আমদানিকারক নাকি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা?

অভিযোগপত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য খালাসের ক্ষেত্রে কুরিয়ার সার্ভিস, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান, বন্ড সুবিধা এবং কাস্টমসের অনুমোদন—প্রতিটি ধাপে একাধিক পক্ষের ভূমিকা থাকে।

তাহলে বিপুল রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ সত্য হলে এর দায় শুধু সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ওপর বর্তাবে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রিতে কারা পণ্য অ্যাসেসমেন্ট করেছেন, কারা অনুমোদন দিয়েছেন এবং কোন নথির ভিত্তিতে পণ্য খালাস হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ।

দুদক-এনবিআরের সামনে এখন যেসব প্রশ্ন

অভিযোগের অনুলিপি ঢাকা কাস্টম হাউসের কমিশনার এবং এনবিআরের গোয়েন্দা শাখা সিআইআইসির মহাপরিচালকের কাছেও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারী জানিয়েছেন।

এখন তদন্তে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন—

এক. ২০২৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট তিন প্রতিষ্ঠানের নামে মোট কতটি বিল অব এন্ট্রি হয়েছে?

দুই. এসব প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্সের বৈধতা ও কার্যক্রমের অবস্থা কী ছিল?

তিন. আমদানিকৃত পণ্যের প্রকৃত মূল্য ও আদায়কৃত শুল্কের মধ্যে কোনো অসংগতি ছিল কি না?

চার. পণ্য খালাসের প্রতিটি পর্যায়ে কোন কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করেছেন?

পাঁচ. ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগের কোনো প্রত্যক্ষ, ডিজিটাল বা আর্থিক প্রমাণ রয়েছে কি না?

ছয়. ৩৩ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির হিসাব কোন কোন চালান ও নথির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে?

অভিযোগ অস্বীকার রাকিবের

৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগের বিষয়ে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুর রাকিবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “এটা একটা ভুয়া অভিযোগ। আপনি আমার অফিসে আসেন। কফির দাওয়াত রইল।”

রাজস্ব কর্মকর্তা ফরিদুজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি লিখিতভাবে অভিযোগকারীকে চেনেন না বলে দাবি করেন। তবে তার পাঠানো চিঠিতে থাকা অভিযোগকারীর স্বাক্ষর এবং দুদক ও এনবিআরে দেওয়া অভিযোগপত্রে থাকা স্বাক্ষরের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে বলে অভিযোগপত্রের সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনায় দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি যাচাই করাও তদন্তের অংশ হতে পারে।

ফরিদুজ্জামানও প্রতিবেদকের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার পরিবর্তে তার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করার অনুরোধ করেছেন।

তদন্তেই মিলবে আসল চিত্র

৩৩ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকি, বন্ধ প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্য খালাস এবং ৮৫ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন দুদক ও এনবিআরের তদন্তের দাবি রাখে।

অভিযোগগুলো সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে, এত বিপুল পরিমাণ পণ্য কীভাবে কাস্টমসের বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করে খালাস হলো এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত। আর অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল বা বিভ্রান্তিকর হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

অভিযোগের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট বিল অব এন্ট্রি পরীক্ষা, রাজস্ব হিসাব পুনর্মূল্যায়ন এবং পণ্য খালাসের পুরো প্রক্রিয়া অনুসন্ধান করলেই বেরিয়ে আসতে পারে—৩৩ কোটি টাকার কথিত রাজস্ব ফাঁকির নেপথ্যে আসলে কী ঘটেছিল।



ফেসবুকে আমরা