
গণপূর্ত উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে দুর্ধর্ষ সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম—ভুক্তভোগীদের বিস্ফোরক অভিযোগ
ঢাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরে যেন এক অদৃশ্য সম্রাটের রাজত্ব চলছে—এমনটাই অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদারদের। সেই ‘সম্রাট’ আর কেউ নন, নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম। অভিযোগ উঠেছে, তিনি উপদেষ্টার নাম ভাঙিয়ে নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বণ্টন নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গত আট মাসেই তিনি শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন—এমন অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক)।
সূত্রগুলো বলছে, গণপূর্তে আতিকুল ইসলাম এখন শুধু একজন প্রকৌশলী নন—তিনি একটি সিন্ডিকেটের কেন্দ্রবিন্দু। তার অফিস যেন ক্ষমতার দরবার। কমিশন ছাড়া নড়ে না কোনো ফাইল। পছন্দের ঠিকাদার না হলে কাজ পাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আর সাংবাদিকদের প্রবেশ?—সেটা প্রায় নিষিদ্ধ।
‘মুকুটহীন সম্রাট’ আতিকুল
অভিযোগকারীরা বলছেন, আতিকুল ইসলামের দাপট এতটাই প্রবল যে আইন, আদালত, এমনকি প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও কার্যত তার প্রভাবের বাইরে নন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ—তিনি নিজস্ব গুন্ডা বাহিনী ও প্রভাবশালী প্রকৌশলীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছেন।
গণপূর্তের ভেতরেই তাকে বলা হয়—
“যিনি পারেন না, এমন কাজ নেই।”
১৭ বছর ঢাকায়, বাইরে বদলি হয়নি একদিনও!
নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর বদলি হওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, গত ১৭ বছর ধরে তিনি ঢাকার সবচেয়ে লোভনীয় ডিভিশনগুলোতেই ঘুরেফিরে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
সর্বশেষ, ১৪ জুলাই তাকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ থেকে শেরেবাংলা নগর বিভাগ-৩-এ বদলি করা হয়—দুটি বিভাগই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থনৈতিকভাবে ‘হটস্পট’ হিসেবে পরিচিত।
টেন্ডার সিন্ডিকেটের গডফাদার?
ঠিকাদারদের অভিযোগ, আতিকুল ইসলাম টেন্ডার কারসাজির এক অদৃশ্য মাস্টারমাইন্ড।
তার কৌশল—
‘ঘুপচি টেন্ডার’
‘বিশেষ ক্লজ’
ডিজিটাল ডেটাবেজের অপব্যবহার
সব মিলিয়ে এমন দুর্নীতি, যা খালি চোখে ধরা পড়ে না, কিন্তু কোটি কোটি টাকা গায়েব হয়ে যায়।
৫ বছরে অন্তত ৫০ কোটি টাকার গরমিল?
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগে বলা হয়েছে,
২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তার তত্ত্বাবধানে হওয়া রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পগুলো পুনরায় অডিট করলে অন্তত ৫০ কোটি টাকার গরমিল পাওয়া যাবে।
আরও অভিযোগ—
৩ বছরে ৬০ কোটি টাকার অতিরিক্ত দরপত্র
সেখান থেকে আত্মসাৎ ১০ কোটি টাকা
১২০টি কাজের বিপরীতে রহস্যজনকভাবে ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ
বেনামে সম্পদের পাহাড়
অভিযোগ অনুযায়ী, অবৈধ অর্থ দিয়ে তিনি—
ময়মনসিংহে ২৫ বিঘার মাছের খামার
ঢাকার অভিজাত এলাকায় ১৪–১৫টি প্লট ও ফ্ল্যাট
একাধিক সম্পত্তি বেনামে
এসব সম্পত্তির বেশিরভাগই নাকি আত্মীয়স্বজনের নামে।
রাজনৈতিক তহবিলে অনুদান?
ভুক্তভোগীদের দাবি, ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের তহবিলে মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়েছেন তিনি। এমনকি নিজেই মাঠে সক্রিয় ছিলেন বলে অভিযোগ।
বক্তব্য জানতে চাইলে নীরবতা
এই বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি, এমনকি খুদেবার্তারও জবাব দেননি।
কী বলছে সংশ্লিষ্টরা?
দুদক সচিব:
“দুর্নীতিবাজ যত ক্ষমতাধরই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান:
“রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকায় দুর্নীতিবাজরা দীর্ঘদিন টিকে যায়। এদের নির্মূল করা কঠিন।”
গণপূর্ত উপদেষ্টা মো. আদিলুর রহমান খান:
“লিখিত অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”