
সরকারি চাকরিতে থেকেও ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ, দুদকে তদন্তের দাবি
জাহিদুল আলম:
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) মো. আবুল বাসারের বিরুদ্ধে সরকারি চাকরির বিধিবিধান লঙ্ঘন করে আবাসন ব্যবসায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত আবেদন করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে তার সঙ্গে ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডের কথিত সম্পৃক্ততা, স্বজনদের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা, ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় আবুল বাসার সরাসরি কিংবা ঘনিষ্ঠ স্বজনদের মাধ্যমে ডেভেলপার ব্যবসায় সম্পৃক্ত হয়েছেন। বিশেষ করে ভাই ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের মাধ্যমে নির্মাণাধীন প্রকল্পের তদারকি, ফ্ল্যাট বিক্রি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ পরিচালিত হচ্ছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি এবং কোনো কর্তৃপক্ষের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
সরকারি চাকরি বনাম ব্যক্তিগত ব্যবসা
অভিযোগপত্রে সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালার বিষয়টি সামনে এনে বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারী ব্যবসা বা বাণিজ্যে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীর প্রশ্ন, আবুল বাসারের নিজের নামে ব্যবসায়িক মালিকানা না থাকলেও তার অর্থ, স্বার্থ বা নিয়ন্ত্রণ অন্য কোনো ব্যক্তি কিংবা স্বজনের নামে পরিচালিত হচ্ছে কি না। এ কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি রেকর্ড, অংশীদারিত্বের নথি, ব্যাংক হিসাব, লেনদেন ও প্রকৃত সুবিধাভোগী যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
ফ্ল্যাট বিক্রির অর্থ কোথায়?
অভিযোগে বিভিন্ন নির্মাণাধীন ও নির্মিত ভবনের ফ্ল্যাট-অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রির সঙ্গে আবুল বাসার ও তার স্বজনদের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বিক্রয়চুক্তি, বায়না, দলিল, ব্যাংক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট আয়কর নথি পরীক্ষা করার দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে বিক্রয়লব্ধ অর্থ কার হিসাবে জমা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আয়কর রিটার্নে তা প্রদর্শিত হয়েছে কি না—তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
স্ত্রীও গণপূর্তের প্রকৌশলী
অভিযোগের আরেকটি দিক হলো, আবুল বাসারের স্ত্রী গুলনাহারও গণপূর্ত অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম) পদে কর্মরত বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই একই অধিদপ্তরের প্রকৌশলী হওয়ায় তাদের নামে বা স্বজনদের নামে থাকা সম্পদ, ব্যবসায়িক সম্পর্ক ও আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
তবে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা নিজেই কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র ও আর্থিক তথ্য যাচাই প্রয়োজন।
‘অভিযোগ মিথ্যা’, দাবি আবুল বাসারের
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল বাসার অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, সরকারি চাকরিতে থেকে তিনি কোনো ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে জড়িত নন এবং স্বজনদের নামে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই।
তিনি আরও জানান, দুদকে অভিযোগ দায়েরের বিষয়টি তার নজরে এসেছে এবং কারও স্বার্থে আঘাত লাগার কারণে এ ধরনের অভিযোগ করা হয়ে থাকতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে
গণপূর্তের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অভিযোগটি তদন্তের আওতায় এলে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ বিবরণী, আয়কর নথি ও ব্যবসায়িক কাগজপত্র যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
সংশ্লিষ্ট সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, কোনো কর্মকর্তা অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি কর্মচারীর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা উচিত বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দুদকের অনুসন্ধানে যেসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ
অভিযোগটি যাচাই করতে হলে—
ডালাস ডেভেলপারস অ্যান্ড প্রপার্টিজ লিমিটেডের মালিকানা ও অংশীদারিত্বের নথি;
আবুল বাসার ও তার স্ত্রী-স্বজনদের সম্পদ বিবরণী;
সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাব ও বড় অঙ্কের লেনদেন;
ফ্ল্যাট বিক্রির চুক্তি ও অর্থপ্রাপ্তির তথ্য;
আয়কর রিটার্ন ও ঘোষিত আয়ের সঙ্গে সম্পদের সামঞ্জস্য;
ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ-উল আলমের সঙ্গে কথিত আর্থিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক;
কোনো সরকারি অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়িক সম্পৃক্ততা ছিল কি না—
এসব তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগের একদিকে রয়েছে আবুল বাসারের সম্পূর্ণ অস্বীকার ও নির্দোষিতার দাবি, অন্যদিকে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে রয়েছে ব্যাংক হিসাব, সম্পদ ও ব্যবসায়িক নথি যাচাইয়ের দাবি। ফলে অভিযোগটির প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক অনুসন্ধানই হবে মূল বিষয়।