October 28, 2026, 10:00 pm
শিরোনাম :
অপরাধ ঢাকতে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি: ফেসবুকে জেসিকার ‘আত্মহত্যার হুমকি’ রেজিস্টারে মিলছে না হিসাব, তাহলে কৃষকের সার যাচ্ছে কোথায়? ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কাল ভোট, কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে নির্বাচনি সরঞ্জাম ‎ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অংশে ডেমরা সেতু সংস্কার কাজের জন্য   ৩ কিলোমিটার জুড়ে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা রূপগঞ্জে লক্ষীপূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে হাজী মাসুমের শুভেচ্ছা বিনিময় পটুয়াখালীতে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সারারাত ধরে পরিষ্কার হলো পরিষ্কার হলো ঢাকা- সিলেট মহাসড়ক কালীগঞ্জে ডাকাতির ঘটনায় মালামাল উদ্ধারসহ -২ ডাকাত গ্রেফতার চৌদ্দগ্রামে আ’লীগের তান্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল পায়রা নদীতে যৌথ অভিযানে সাড়ে ৭ লাখ টাকার জাল জব্দ

বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো: ২৮৩ কোটি টাকার আয়-ব্যয়ে প্রশ্ন, যন্ত্রাংশ ও জ্বালানি খাতে তদন্তের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক,

 

রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ঢাকা ট্রাক ডিপোর আয়-ব্যয়, যন্ত্রাংশ ও টায়ার কেনাকাটা, জ্বালানি ব্যবহার এবং বিভিন্ন পরিচালন ব্যয় নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংস্থাটির চলতি দায়িত্বে থাকা উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. আশরাফুল আলমের দায়িত্বকালীন সময়ের বিভিন্ন আর্থিক হিসাব তুলে ধরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ করেছেন ডিপোটির চালক মো. রফিকুল ইসলাম। অভিযোগে কয়েকটি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়, ক্রয়মূল্যের উল্লেখযোগ্য পার্থক্য, জ্বালানি ব্যবহারের হিসাবের অসংগতি এবং নগদ অর্থ উত্তোলনের যথাযথ হিসাব না থাকার দাবি করা হয়েছে।

 

অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে অভিযোগে উল্লিখিত আর্থিক নথি, ক্রয়াদেশ, দরপত্র, বিল-ভাউচার, ব্যাংক হিসাব ও সংশ্লিষ্ট লগবুক পরীক্ষা করা হলে সরকারি অর্থের ব্যবহার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

চার বছরে আয় ২৮৩ কোটি টাকা, ব্যয় ২৪৮ কোটি

 

অভিযোগে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ট্রাক ডিপোর মোট রাজস্ব আয় ছিল ২৮৩ কোটি ৮৫ লাখ ২২ হাজার টাকা। এ সময়ে মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে ২৪৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। অভিযোগকারীর হিসাবে, আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান ছিল ৩৫ কোটি ৭৬ লাখ ২২ হাজার টাকা।

 

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এ সময়ে জ্বালানি খাতে ব্যয় হয়েছে ১০৭ কোটি ৪৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৯ টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ৩৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এত বড় অঙ্কের জ্বালানি ব্যয়ের ক্ষেত্রে যানবাহনের চলাচল, নির্ধারিত রুট, প্রতি কিলোমিটারে জ্বালানি ব্যবহারের মানদণ্ড এবং বাস্তব সরবরাহের সঙ্গে হিসাবের মিল রয়েছে কি না, তা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

 

তবে আয়-ব্যয়ের ব্যবধান বা জ্বালানি খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় নিজে থেকেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। সংশ্লিষ্ট সময়ে ডিপোর কার্যক্রম, যানবাহনের সংখ্যা, পরিচালন ব্যয় এবং অনুমোদিত বাজেট বিবেচনায় নিয়ে হিসাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 

একই যন্ত্রাংশের দামে বড় পার্থক্য কেন?

 

ঢাকা ট্রাক ডিপোতে যন্ত্রাংশ কেনা ও মেরামত বাবদ ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৯ কোটি ৪৯ লাখ ১ হাজার ৮১১ টাকা ব্যয়ের কথা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের ডিসেম্বরের আগের সময়ে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১১ টাকা এবং পরবর্তী সময়ে ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ১০০ টাকা।

 

অভিযোগে ক্লাচ প্লেট কেনার কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চে একটি ক্লাচ প্লেট ৮ হাজার ৫০০ টাকায় কেনা হয়। একই ধরনের যন্ত্রাংশ ওই মাসের পরবর্তী সময়ে ১৩ হাজার ৩০০ টাকা এবং ২০২৩ সালের জুনে ১৬ হাজার ৩৫০ টাকায় কেনার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

 

একই ধরনের পণ্যের দামে এমন পার্থক্যের কারণ কী—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে পণ্যের ব্র্যান্ড, মান, মডেল, সরবরাহের শর্ত, কর, পরিবহন ব্যয় ও ক্রয়ের সময়কার বাজারদর তুলনা না করে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। সংশ্লিষ্ট দরপত্র, কার্যাদেশ, সরবরাহকারীর বিল এবং বাজারদরের তুলনামূলক তথ্য পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 

অভিযোগকারীর দাবি, যন্ত্রাংশ কেনাকাটায় ভুয়া ভাউচার ও নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের ঘটনাও থাকতে পারে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে পণ্য গ্রহণের রেজিস্টার, স্টক রেজিস্টার, মেরামতের ওয়ার্কশপ রেকর্ড এবং সরবরাহকারীদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা জরুরি।

 

টায়ার কেনাকাটায় মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যা কী?

 

অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত টায়ার কেনায় ব্যয় হয়েছে ১০ কোটি ৪২ লাখ ৫১ হাজার ৯৮৮ টাকা।

 

অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চে একটি ১০.০০-২০ এমআরএফ টায়ারের ক্রয়মূল্য ছিল ২৭ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের জুনে একই ধরনের টায়ারের দাম ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ৩৮ হাজার ১৫০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

একই সরবরাহকারীর কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে কেনা টায়ারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে অভিযোগে। তবে দরপত্রের শর্ত, পণ্যের নির্দিষ্ট মডেল, সরবরাহের পরিমাণ, কর এবং তৎকালীন বাজারদর যাচাই ছাড়া এই মূল্যবৃদ্ধিকে অনিয়ম হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

 

দুদক ও বিআরটিসির নিরীক্ষা বিভাগ চাইলে সংশ্লিষ্ট ক্রয়ের নথি পর্যালোচনা করে দেখতে পারে, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, বাজারদরের সঙ্গে ক্রয়মূল্যের সামঞ্জস্য ছিল কি না এবং পণ্যগুলো যথাযথ মানে সরবরাহ করা হয়েছিল কি না।

 

জ্বালানি, টোল-ফেরি ও আনলোডিং ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

 

অভিযোগে জ্বালানি ব্যবহারের হিসাবেও অসংগতির দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর বক্তব্য, বাসের রক্ষণাবেক্ষণ লগবুক এবং ট্রাফিক বিভাগের যাত্রা-সংক্রান্ত লগবুকে উল্লেখ করা কিলোমিটারের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জ্বালানি বরাদ্দ, প্রকৃত চলাচল এবং খরচের হিসাব মিলিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।

 

এ ছাড়া টোল ও ফেরি খাতে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা এবং আনলোডিং খাতে একই পরিমাণ ব্যয়ের অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব ব্যয়ের কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সমর্থনকারী নথি পাওয়া যায়নি এবং ব্যাংক থেকে নগদ অর্থ উত্তোলনের যথাযথ হিসাবও পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

 

এসব খাতে অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের ক্যাশবুক, ব্যাংক স্টেটমেন্ট, ভাউচার, টোল রসিদ, ফেরির টিকিট, পরিবহন চালান, আনলোডিং রেজিস্টার এবং অনুমোদনকারী কর্মকর্তাদের নথি যাচাই করা দরকার। অভিযোগে উল্লিখিত ব্যয়ের অঙ্কগুলোও মূল হিসাবের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

 

পরবর্তী সময়ের আয়-ব্যয়ের তুলনা

 

অভিযোগে ঢাকা ট্রাক ডিপোর পরবর্তী দুই ইউনিট প্রধানের সময়কার নিট আয়ের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে নিট আয় দেখানো হয়েছে ৮ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত আট মাসে নিট আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৭ কোটি ১২ কোটি নয়—অভিযোগে উল্লিখিত অঙ্কটি ৭ কোটি ১১ লাখ ৮০ হাজার টাকা।

 

এই হিসাব অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ের মাসিক গড় নিট আয় আগের সময়ের তুলনায় বেশি ছিল বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন। তবে বিভিন্ন সময়ের আয়-ব্যয়ের তুলনা করতে হলে বেতন, জ্বালানি, যানবাহনের সংখ্যা, ট্রিপ, মেরামত, রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ের পরিবর্তন বিবেচনায় নিতে হবে। একই ভিত্তিতে হিসাব পুনর্গণনা না করে শুধু লাভের অঙ্ক দিয়ে আগের দায়িত্বকালের অনিয়ম প্রমাণ করা সম্ভব নয়।

 

দুদকের কাছে যেসব নথি যাচাইয়ের দাবি

 

অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সময়ের আয়-ব্যয়ের খতিয়ান, ক্রয় ও দরপত্রের নথি, সরবরাহকারীর বিল, ব্যাংক লেনদেন, নগদ উত্তোলনের হিসাব, জ্বালানি লগবুক, টোল-ফেরির রসিদ এবং আনলোডিংয়ের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কোন কর্মকর্তা কোন পর্যায়ে ক্রয়, বিল অনুমোদন ও অর্থ পরিশোধের দায়িত্বে ছিলেন, তা চিহ্নিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

অভিযোগকারী রফিকুল ইসলাম দুদককে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সরবরাহ এবং প্রয়োজনে সাক্ষ্য দেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

 

বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. আব্দুল লতিফ মোল্লা অভিযোগের বিষয়ে বলেছেন, যেকোনো অভিযোগ গুরুত্বসহকারে দেখা হয় এবং তদন্তের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে দুর্নীতি সহ্য করা হবে না বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

 

অন্যদিকে, মো. আশরাফুল আলমের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনের জন্য সরবরাহ করা তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

 

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, হিসাবের স্বাধীন নিরীক্ষা এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত আর্থিক ক্ষতি, দায়ী ব্যক্তি এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ।



ফেসবুকে আমরা