
সাত বছরে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ • নিয়োগে অনিয়মের দাবি, যাচাইয়ের অপেক্ষায় তথ্য
বিশেষ সংবাদদাতা:
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর অঞ্চল-১২-তে কর্মরত নাজির ফুয়াদ হাসান আকন্দের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৯ সালে নিম্ন পদে চাকরিতে যোগদানের পর কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেন ও অনিয়মের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি, সম্পদের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ কিংবা কোনো তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এনবিআরের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ফুয়াদ হাসান আকন্দের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
সূত্রের দাবি, গত সেপ্টেম্বরের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অন্তত ১১ জন প্রার্থীকে অনিয়মের মাধ্যমে চাকরিতে যোগদানের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব প্রার্থীর নিয়োগে কোনো আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, নিয়োগবিধি লঙ্ঘিত হয়েছে কি না এবং অভিযুক্ত কর্মচারীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল কি না—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।
নিয়োগসংক্রান্ত আবেদনপত্র, যোগ্যতার সনদ, যাচাই প্রতিবেদন, নিয়োগ কমিটির কার্যবিবরণী এবং চূড়ান্ত নিয়োগাদেশ পর্যালোচনা করলে অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ভাইয়ের নিয়োগ নিয়ে যাচাইয়ের দাবি
অভিযোগে ফুয়াদ হাসান আকন্দের ভাই শামীম আশরাফের উচ্চমান সহকারী পদে নিয়োগের বিষয়টিও উঠে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, নিয়োগের সময় ঠিকানা ও জেলা কোটাসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহারে অনিয়ম হয়ে থাকতে পারে। শামীম আশরাফ বর্তমানে কর সার্কেল-২৬৩ (সাভার)-এ কর্মরত বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে কেবল পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা ঠিকানাসংক্রান্ত প্রশ্নের ভিত্তিতে নিয়োগে জালিয়াতি হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। নিয়োগের সময়কার স্থায়ী ঠিকানা, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, সংশ্লিষ্ট কোটার শর্ত, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং যাচাইকারী কর্তৃপক্ষের প্রতিবেদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এসব নথিতে অসংগতি পাওয়া গেলে তার ব্যাখ্যা চেয়ে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।
সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
অভিযোগকারীদের দাবি, চাকরিজীবনের প্রায় সাত বছরে ফুয়াদ হাসান আকন্দ অর্ধশত কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ অর্জন করেছেন। রাজধানী ঢাকা ও ময়মনসিংহের ত্রিশালে জমি, ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন স্থাবর সম্পদ কেনা এবং পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ রাখার অভিযোগও রয়েছে।
তবে সম্পদের পরিমাণ, মালিকানা, ক্রয়কাল ও অর্থের উৎস সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট দলিল প্রকাশ্যে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে উল্লিখিত সম্পদের মূল্য বা সেগুলো অবৈধ অর্থে অর্জিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ আয়, আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী, জমি ও ফ্ল্যাটের দলিল এবং সম্পদ কেনার অর্থের উৎস পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। পরিবারের সদস্যদের নামে সম্পদ থাকলে সেগুলোর প্রকৃত মালিকানা ও অর্থের উৎসও আইনসম্মতভাবে যাচাই করা যেতে পারে। এতে অভিযোগের সত্যতা ও সম্পদের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
কর্তৃপক্ষের করণীয় কী?
সরকারি নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের প্রশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ নিয়োগসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করতে পারে। অভিযোগের পক্ষে প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরে আনার সুযোগ রয়েছে।
তদন্তে বিশেষভাবে কয়েকটি বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন—নিয়োগপ্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা আর্থিক লেনদেন হয়েছিল কি না, প্রার্থীদের যোগ্যতা ও ঠিকানার তথ্য সঠিক ছিল কি না, অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের সঙ্গে বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না এবং কোনো সরকারি কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না।
অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফুয়াদ হাসান আকন্দের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
জনস্বার্থে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
এনবিআরের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ ও সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা সন্দেহের অবসান ঘটানো—দুই ক্ষেত্রেই স্বচ্ছ তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে নথিভিত্তিক অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য গ্রহণই হতে পারে কার্যকর পদক্ষেপ।