
অথরাইজেশন নিয়ে প্রশ্নের পরও প্রাণ-আরএফএলকে সুবিধা দিতে দরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফের বিরুদ্ধে এসি ক্রয়ের একটি দরপত্রে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। দরপত্র মূল্যায়নে MS Mamun & Brothers-এর অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও প্রতিষ্ঠানটিকে এসএলটি (শর্টলিস্ট/টেকনিক্যাল মূল্যায়ন পর্যায়) পর্যায়ে রেসপনসিভ দেখিয়ে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এর মাধ্যমে পরোক্ষভাবে প্রাণ-আরএফএলকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি সরকারি ক্রয়বিধি (PPR) অনুসরণ করে হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দরপত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসি ক্রয়ের ওই টেন্ডারে প্রাণ-আরএফএল, মজিদ অ্যান্ড সন্স, আমানত এন্টারপ্রাইজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্র মূল্যায়নের অংশ হিসেবে ভিআরএফ এসির অথরাইজেশন যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির কাছে ই-মেইল পাঠানো হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আমানত এন্টারপ্রাইজ ও মজিদ অ্যান্ড সন্সের অথরাইজেশন সংশ্লিষ্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি ই-মেইলের মাধ্যমে নিশ্চিত করে। অন্যদিকে প্রাণ-আরএফএলের দাখিল করা অথরাইজেশন নিয়ে ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি DunHum Bush-এর পক্ষ থেকে প্রথমে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের জন্য প্রাণ-আরএফএলকে কোনো অথরাইজেশন দেওয়া হয়নি।
এ পর্যায়ে প্রাণ-আরএফএলের দরপত্রের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। অভিযোগকারীদের দাবি, পরবর্তীতে প্রাণ-আরএফএলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বিষয়টি পুনরায় যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির কাছ থেকে নতুন করে অথরাইজেশন পাওয়ার কথা জানানো হয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রথম ও পরবর্তী ই-মেইলের মধ্যে পার্থক্য কেন তৈরি হলো, কার যোগাযোগের পর নতুন অথরাইজেশন দেওয়া হলো এবং দরপত্র মূল্যায়নের সময় এ বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর চান সংশ্লিষ্টরা।
‘অভিজ্ঞতা না থাকলেও রেসপনসিভ’
দরপত্রের অভিজ্ঞতার শর্ত নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, MS Mamun & Brothers-এর দরপত্রে চাওয়া অভিজ্ঞতার বিপরীতে BRF এয়ারকুলারের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। এরপরও প্রতিষ্ঠানটিকে এসএলটি পর্যায়ে রেসপনসিভ রেখে দরপত্র মূল্যায়ন করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো দরদাতার নির্ধারিত অভিজ্ঞতা না থাকলে তাকে কীভাবে রেসপনসিভ হিসেবে বিবেচনা করা হলো, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। তাদের অভিযোগ, সরকারি কর্মকর্তাদের ‘উচ্চবিলাসী আকাঙ্ক্ষা’ পূরণ এবং কথিত অর্থনৈতিক চুক্তির মাধ্যমে প্রাণ-আরএফএলকে কাজ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
পিপিআর অনুসরণের প্রশ্ন
দরপত্র মূল্যায়নের ক্ষেত্রে কোনো প্রতিষ্ঠানকে রেসপনসিভ ঘোষণা করার আগে টেন্ডার ডকুমেন্টে নির্ধারিত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করার কথা। অভিযোগকারীরা বলছেন, MS Mamun & Brothers-এর অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও রেসপনসিভ ঘোষণা করা হয়ে থাকলে সেটি কীভাবে এবং কোন বিধানের আওতায় করা হয়েছে, তা নথি যাচাই করলেই স্পষ্ট হবে।
তাদের দাবি, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী, টেকনিক্যাল মূল্যায়ন প্রতিবেদন, অভিজ্ঞতার সনদ এবং সংশ্লিষ্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির যাচাই-সংক্রান্ত ই-মেইল প্রকাশ ও পরীক্ষা করা হলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
কমিশন দাবির অভিযোগও
এদিকে একাধিক ঠিকাদারের অভিযোগ, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ঢাকা মেট্রো অঞ্চলের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদানের পর বিভিন্ন উন্নয়নকাজের দরপত্রে কমিশন দাবির প্রবণতা তৈরি হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন চাওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, দরপত্রে অংশ নেওয়ার পর কাজ পাওয়ার পর্যায়ে কমিশনের বিষয়টি সামনে আসে। নির্ধারিত অর্থ দিতে অনাগ্রহী হলে কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয় বলেও তাদের অভিযোগ।
তবে কমিশন দাবির এসব অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তদন্তের দাবি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে দরপত্রের মূল নথি, টেন্ডার ডকুমেন্টে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্ত, MS Mamun & Brothers-এর দাখিল করা অভিজ্ঞতার সনদ, মূল্যায়ন কমিটির কার্যবিবরণী এবং প্রাণ-আরএফএলের অথরাইজেশন যাচাইয়ের প্রথম ও পরবর্তী ই-মেইল পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে দরপত্র মূল্যায়নের প্রতিটি ধাপে কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং কোনো প্রতিষ্ঠানকে রেসপনসিভ ঘোষণার পেছনে কী যুক্তি ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম শরীফের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
অভিযোগগুলো সত্য হলে সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হবে। আর অভিযোগগুলো সঠিক না হলে সংশ্লিষ্ট নথি ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা স্পষ্ট করা সম্ভব। তাই দরপত্রের নথিভিত্তিক নিরপেক্ষ তদন্তই প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের প্রধান উপায় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।