
ঘুষ, ভুয়া বিল-ভাউচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ; দুদকে লিখিত অভিযোগ, বিপুল সম্পদের তথ্য দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল (ই/এম) বিভাগ-৫-এর নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ঘুষ, ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার আগেই বিল ছাড়, দরপত্রে অনিয়ম এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন না করেই ভুয়া বা অসংগতিপূর্ণ বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ ছাড়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে নির্দিষ্ট হারে অর্থ নেওয়া এবং দরপত্র প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, এসব অনিয়মের মাধ্যমে গত কয়েক বছরে বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন তামজিদ হোসেন। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, প্রকল্পের বিল-ভাউচার, সম্পদ বিবরণী এবং সরকারি তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
কয়েক কোটি টাকার সম্পদের দাবি
অভিযোগে তামজিদ হোসেনের নামে ও স্বজনদের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় বিপুল সম্পদ থাকার দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ধানমন্ডি ২৭/১ এলাকায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বর্গফুটের একটি স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের মূল্য আনুমানিক ৫ কোটি টাকা বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া মোহাম্মদপুরের পিসি কালচার হাউজিং সোসাইটির টেক রোড-৭ এলাকায় শ্বশুর মো. জাহিদ মিয়ার সঙ্গে যৌথ মালিকানায় একটি সাততলা ভবন নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীর হিসাবে ভবনটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।
এছাড়া রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকায় নিজ নামে ও বেনামে প্রায় ৩০ একর জমি থাকার দাবিও করা হয়েছে। এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
দুদকের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির অভিযোগ
তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, দুদক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঠিকাদারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে প্রায় ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট মামলা, অর্থ লেনদেনের নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও গুরুতর অভিযোগ
তামজিদ হোসেনের বিরুদ্ধে এক গৃহকর্মীকে ধর্ষণের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগে ওই গৃহকর্মীর নাম সুফিয়া বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে এবং আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মামলা, মেডিকেল রিপোর্ট, আদালতের নথি কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তসংক্রান্ত কোনো প্রামাণ্য নথি প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
এ ছাড়া সদ্য সাবেক উপবিভাগীয় প্রকৌশলী রাজিয়া সুলতানাকে ঘিরেও তামজিদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ঠিকাদার। এসব অভিযোগেরও স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
২০১৩ সালে চাকরিতে যোগদানের পর সম্পদ বৃদ্ধির দাবি
অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৩ সালে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদানের পর তামজিদ হোসেনের সম্পদের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অভিযোগে তার নামে-বেনামে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের একটি তালিকাও দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে তার আয়কর নথি, সম্পদ বিবরণী, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল, ফ্ল্যাট ও ভবনের মালিকানা এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সরকারি নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ তামজিদ হোসেনের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাকে পাওয়া যায়নি। তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
অভিযোগগুলো সত্য কি না, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা ও আইনগত কর্তৃপক্ষের। তবে সরকারি একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এতগুলো গুরুতর অভিযোগ ওঠায় সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের নথি, সম্পদের উৎস এবং অভিযোগে উল্লিখিত আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।