September 12, 2026, 1:39 pm
শিরোনাম :
কুমিল্লায় ছিনতাই ও মাদক সেবনের অভিযোগে দেশীয় অস্ত্রসহ ১৯ জন গ্রেপ্তার পটুয়াখালীতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান মুগদা ফাঁড়িতে অভিযোগের ছায়া ‎চৌদ্দগ্রামে শহীদ হাজী সুরুজ মিয়া স্মৃতি গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টের পুরস্কার বিতরণে, মোহাম্মদ তাহের। মুগদা মেডিকেলের ওয়ার্ড থেকে অজ্ঞাতনামা এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার, ময়নাতদন্তের জন্য ঢামেকে প্রেরণ পে-স্কেলের গেজেট দ্রুত প্রকাশের দাবি পটুয়াখালীতে সমাবেশ ও ৫১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা খানসামায় দুই দিনের অভিযানে ১৫,০০ অধিক বস্তা সার জব্দ ডেঙ্গু মোকাবেলায় পটুয়াখালী হাসপাতালে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান রামপুরা থানা মহিলা দলে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন ইঞ্জিনিয়ার এস বি রিতা খানসামায় অভিযান চালিয়ে ৯২০ বস্তা সার জব্দ

মুগদা ফাঁড়িতে অভিযোগের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক

মাদক-জুয়া ও কথিত টাকা লেনদেনের অভিযোগ; আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার দাবি, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ—দেড় বছরেও নজরদারি কোথায়?

নিজস্ব প্রতিবেদক:

রাজধানীর মুগদা থানার মানিকনগর পুলিশ ফাঁড়ি ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ উঠলেও কার্যকর তদন্ত ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। মাদক ও জুয়ার আসর, আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে কথিত অর্থ লেনদেন, নিয়মিত টাকা সংগ্রহ, সরকারি মোটরসাইকেলের জ্বালানি ব্যবহারে অসঙ্গতির অভিযোগ—সব মিলিয়ে প্রশ্নের কেন্দ্রে ফাঁড়ির দায়িত্ব পালন ও তদারকি ব্যবস্থা।

এর মধ্যেই কথিত ঘুষ লেনদেনের ভিডিও-অডিওসহ বিভিন্ন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা এসআই কাইম বাহাদুর স্থানীয় মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছেন এবং সাংবাদিকদের আক্রমণে উৎসাহিত করেছেন—এমন অভিযোগও সামনে এসেছে।

 

আরও গুরুতর দাবি, তিনি নাকি স্থানীয়দের বলেছেন—‘সিস্টেম’ করে একই এলাকায় আরও এক বছর থাকার ব্যবস্থা করেছেন।

 

এসব অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন শুধু একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে নিয়ে নয়; প্রশ্ন উঠবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ নজরদারি, জবাবদিহি ও শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়েও।

 

তবে অভিযোগগুলোর কোনোটি আদালত বা স্বাধীন তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে—এমন দাবি এই প্রতিবেদনে করা হচ্ছে না। বরং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে নথিভিত্তিক তদন্তের দাবি উঠেছে।

 

অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ

 

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় বছর ধরে মানিকনগর ফাঁড়িতে দায়িত্ব পালন করছেন এসআই কাইম বাহাদুর। এ সময়ে মানিকনগর প্রেম গলি, চান্দা গলি, কমিশনার গলি, বালুর মাঠ, ওয়াসা রোড, সবেদাতলা, কুমিল্লা পট্টি ও বিশ্বরোডসহ কয়েকটি এলাকায় মাদক ও জুয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ স্থানীয়ভাবে আলোচিত হয়েছে।

 

স্থানীয়ভাবে কয়েকজনের নামও অভিযোগের সঙ্গে উঠে এসেছে। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। এসব অভিযোগ যাচাইয়ের প্রথম ধাপ হওয়া উচিত গত দেড় বছরের মামলা, জিডি, গ্রেপ্তার, অভিযান ও জব্দের হিসাব প্রকাশ করা।

 

আটক করে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে টাকা?

 

স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার একাধিক দাবি।

কোনো ঘটনায় ৩০ হাজার, কোনো ঘটনায় ২০ হাজার, আবার কোনো ঘটনায় ১৯ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একটি মোটরসাইকেল আটকের ঘটনায় ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।

 

প্রশ্ন হচ্ছে—এসব টাকা নেওয়ার অভিযোগের কোনো লিখিত অভিযোগ, জিডি, সাক্ষ্য, কল রেকর্ড বা আর্থিক লেনদেনের সূত্র আছে কি না?

 

উত্তর পেতে হলে সংশ্লিষ্ট সময়ের আটক রেজিস্টার, জিডি, মামলা, জব্দ তালিকা এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা মিলিয়ে দেখা জরুরি।

 

‘চিনি বাবু’র টাকা সংগ্রহ—কার জন্য?

 

স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, ‘চিনি বাবু’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে মাদকসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ সংগ্রহের বিষয়টি এলাকায় আলোচিত।

 

এমন অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে—কত টাকা সংগ্রহ করা হতো, কার নির্দেশে, কোথায় জমা হতো এবং এর সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্যের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না?

 

এসবের উত্তর অনুমান দিয়ে নয়, তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতেই বের করতে হবে।

 

সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উসকানির অভিযোগ

 

মানিকনগর ফাঁড়িকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকরা অনুসন্ধান শুরু করার পর পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

 

এসআই কাইম বাহাদুর স্থানীয় মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উসকানি দিয়েছেন এবং তাদের আক্রমণে উৎসাহিত করেছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে।

 

অভিযোগটি সত্য হলে এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন সদস্যের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ওপর হামলায় উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা পেশাগত আচরণ ও শৃঙ্খলার গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।

 

অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কথোপকথন, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণ আইনানুগভাবে পরীক্ষা করা জরুরি।

 

‘আরও এক বছর থাকার সিস্টেম’—দাবিটির সত্যতা কী?

 

স্থানীয়দের দাবি, এসআই কাইম বাহাদুর নাকি বলেছেন, তিনি ‘সিস্টেম’ করে আরও এক বছর একই এলাকায় থাকার অনুমতি নিয়েছেন।

 

এটি নিছক কথার কথা, নাকি সত্যিই কোনো প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা প্রভাব খাটানোর ঘটনা—তা পরিষ্কার হওয়া দরকার।

 

কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে, কী আদেশে এবং কোন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় একজন কর্মকর্তার একই স্থানে থাকার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে—সেই নথি প্রকাশ করলেই প্রশ্নের উত্তর মিলতে পারে।

 

কনস্টেবলদের নিয়েও অভিযোগ

 

ফাঁড়ির কয়েকজন কনস্টেবলের দায়িত্ব পালন নিয়েও স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে। সন্ধ্যার পর মাদকসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিদিন ফাঁড়ির ইনচার্জকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার দাবিও করা হয়েছে।

 

এ অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে নেই।

 

তবে অভিযোগটি যাচাই করা কঠিন নয়। সংশ্লিষ্টদের ডিউটি রোস্টার, টহল রেজিস্টার, উপস্থিতি রেকর্ড, সরকারি যানবাহনের লগবুক ও ফাঁড়ির দৈনিক কার্যক্রম মিলিয়ে দেখলেই অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেতে পারে।

 

সরকারি জ্বালানির হিসাবও চাই

 

সরকারি মোটরসাইকেলের জ্বালানি বরাদ্দ ও ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

 

মাসিক বরাদ্দ কত? কত লিটার উত্তোলন হয়েছে? কোন তারিখে কোথায় ব্যবহার হয়েছে? লগবুকের সঙ্গে জ্বালানি বিলের মিল আছে কি?

 

এই চারটি প্রশ্নের নথিভিত্তিক উত্তরেই অভিযোগের একটি বড় অংশ পরিষ্কার হতে পারে।

 

২৫ কেজি তামা: অভিযোগের তদন্ত হয়েছে কি?

 

মানিকনগর বিশ্বরোডের একটি ভাঙারি দোকান ও পাম্পসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ২৫ কেজি তামা আত্মসাতের অভিযোগও সামনে এসেছে।

 

আলামিন নামে এক ব্যক্তিকে এ বিষয়ে কথা বলায় মামলা ও মারধরের ভয় দেখানো এবং সাক্ষী না হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

 

ঘটনাটি নিয়ে জিডি, মামলা বা লিখিত অভিযোগ হয়ে থাকলে তার বর্তমান অবস্থাও প্রকাশ করা প্রয়োজন।

 

 

তদন্ত হলে যেসব নথি সামনে আসতে পারে

 

১. গত দেড় বছরের মাদক ও জুয়া সংক্রান্ত মামলা

২. আটক ব্যক্তিদের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড

৩. জব্দ তালিকা ও আলামতের হিসাব

৪. ফাঁড়ির ডিউটি রোস্টার

৫. টহল রেজিস্টার ও উপস্থিতি রেকর্ড

৬. সরকারি মোটরসাইকেলের লগবুক

৭. জ্বালানি বরাদ্দ ও বিল-ভাউচার

৮. সংশ্লিষ্ট অভিযোগের জিডি/মামলা

৯. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও-অডিওর প্রযুক্তিগত যাচাই

১০. একই এলাকায় দায়িত্ব পালনের মেয়াদসংক্রান্ত প্রশাসনিক আদেশ

 

 

পুলিশ প্রশাসনের সামনে এখন ৫ প্রশ্ন

 

১. গত দেড় বছরে মানিকনগর ফাঁড়ির অধীনে মাদক ও জুয়া সংক্রান্ত কতটি অভিযান, মামলা ও গ্রেপ্তার হয়েছে?

 

২. আটক ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৩০ হাজার, ২০ হাজার, ১৯ হাজার ও ৫০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি?

 

৩. ‘চিনি বাবু’র মাধ্যমে কথিত টাকা সংগ্রহ এবং প্রতিদিন ২ হাজার ৫০০ টাকা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ফাঁড়ি বা থানার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কী জানে?

 

৪. সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে উসকানি এবং সাংবাদিকদের আক্রমণে উৎসাহিত করার অভিযোগ সম্পর্কে এসআই কাইম বাহাদুরের বিরুদ্ধে কোনো বিভাগীয় অনুসন্ধান হয়েছে কি?

 

৫. এসআই কাইম বাহাদুর একই এলাকায় আরও এক বছর থাকার ‘সিস্টেম’ করেছেন—এই দাবির কোনো প্রশাসনিক ভিত্তি আছে কি?

 

 

জনআস্থার প্রশ্ন

 

পুলিশ জনগণের নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। তাই কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি ধামাচাপা দেওয়া যেমন কাম্য নয়, তেমনি যাচাই ছাড়া কাউকে অপরাধী বানানোও অনুচিত।

 

মানিকনগর ফাঁড়িকে ঘিরে অভিযোগগুলোর ক্ষেত্রে এখন প্রয়োজন দৃশ্যমান, নিরপেক্ষ ও নথিভিত্তিক তদন্ত।

 

অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন ও বিভাগীয় বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করতে হবে।

 

কারণ অভিযোগের বিচার না হলে অভিযোগই মানুষের কাছে সত্য হয়ে উঠতে পারে। আর তদন্ত হলে সত্য-মিথ্যা—দুটিই পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ থাকে।

 

মানিকনগরবাসীর প্রত্যাশা—ফাঁড়িতে কোনো ‘সিস্টেম’ নয়, চলুক আইনের সিস্টেম। ঘুষের অভিযোগ নয়, প্রতিষ্ঠিত হোক জবাবদিহি। ভয়ভীতি নয়, নিশ্চিত হোক নাগরিক নিরাপত্তা।

 

প্রতিবেদকের নোট

 

এই প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো স্থানীয়দের বক্তব্য ও অনুসন্ধানে উঠে আসা দাবির ভিত্তিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি বা পুলিশ সদস্যকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, ভিডিও-অডিওর প্রযুক্তিগত যাচাই, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথ গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।



ফেসবুকে আমরা