October 29, 2026, 12:57 am
শিরোনাম :
অপরাধ ঢাকতে সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি: ফেসবুকে জেসিকার ‘আত্মহত্যার হুমকি’ রেজিস্টারে মিলছে না হিসাব, তাহলে কৃষকের সার যাচ্ছে কোথায়? ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কাল ভোট, কেন্দ্রে কেন্দ্রে পৌঁছাচ্ছে নির্বাচনি সরঞ্জাম ‎ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের অংশে ডেমরা সেতু সংস্কার কাজের জন্য   ৩ কিলোমিটার জুড়ে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা রূপগঞ্জে লক্ষীপূজায় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে হাজী মাসুমের শুভেচ্ছা বিনিময় পটুয়াখালীতে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস উপলক্ষে র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত সারারাত ধরে পরিষ্কার হলো পরিষ্কার হলো ঢাকা- সিলেট মহাসড়ক কালীগঞ্জে ডাকাতির ঘটনায় মালামাল উদ্ধারসহ -২ ডাকাত গ্রেফতার চৌদ্দগ্রামে আ’লীগের তান্ডবের প্রতিবাদে জামায়াতের বিক্ষোভ মিছিল পায়রা নদীতে যৌথ অভিযানে সাড়ে ৭ লাখ টাকার জাল জব্দ

পদ পরিবর্তনের পর নতুন পরিচয়ে লবিং শিল্পকলার শামীম আকতারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-জালিয়াতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক

নিজস্ব প্রতিবেদক:

ক্ষমতার অন্ধ দাপট, বেপরোয়া অর্থ আত্মসাৎ, দাপ্তরিক জালিয়াতি আর চরম নৈতিক স্খলন-সব যেন একই সূত্রে গেঁথেছেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির বিতর্কিত কর্মকর্তা এস এম শামীম আকতার।

পতিত বিগত সরকারের রাজনৈতিক আস্কারায় দীর্ঘ দিন অধরা থাকা এই দুর্নীতির রাজপুত্রের বিরুদ্ধে একের পর এক চাঞ্চল্যকর নথি প্রকাশ্যে এলেও তাঁর গায়ে আঁচড় লাগেনি। ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের পর এবার খোলস পাল্টে, ভুয়া পরিচয় জাহির করে নিজের চামড়া বাঁচানো ও আখের গুছানোর এক মরিয়া ও নির্লজ্জ খেলায় মেতেছেন তিনি।

 

দাপ্তরিক নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, রাজশাহী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমিতে দায়িত্ব পালনকালে শামীম আকতারের দুর্নীতির সাম্রাজ্য সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের পা চাটনদার হিসেবে বিশেষ সুবিধা বাগিয়ে নিয়ে তিনি পাঁচবার বিদেশ ভ্রমণ করেন এবং বিধিবিধান বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উপপরিচালকের ‘চলতি দায়িত্ব’ আঁকড়ে রাখেন।

২০১২ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে বিপুল অঙ্কের আর্থিক তছরুপের অকাট্য প্রমাণ মেলে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা হরিলুট, বিভিন্ন প্রকল্পের ১৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা বেনামী চেকে তুলে পকেটস্থ করা এবং ‘দেশজ সংস্কৃতির বিকাশ’ প্রকল্প থেকে সরাসরি ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা গায়েব করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নথিপত্র এখন প্রকাশ্যে।

 

স্বজনপ্রীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ার নজির স্থাপন করেছেন এই সহকারী পরিচালক। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একাডেমিকে তিনি নিজের ব্যক্তিগত সংস্থায় পরিণত করেছিলেন। দরিদ্র শিল্পীদের পাওনা সম্মানী বকেয়া রাখা, গবেষণার তহবিল আত্মসাৎ, এমনকি গায়ের জোরে অন্যের লেখা গবেষণামূলক বইয়ের মূল লেখকত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার মতো জঘন্য অপরাধও প্রমাণিত হয়েছে। তাঁর এই তাণ্ডবের বিরুদ্ধে তৎকালীন সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন একাডেমির গবেষণা কর্মকর্তা বেনজামিন টুডু।

একজন সহকারী পরিচালকের সীমিত বেতন-ভাতার আড়ালে শামীম আকতারের সম্পদের পাহাড় চোখ কপালে তোলার মতো। রাজধানীতে তিনটি বিলাস বহুল ফ্ল্যাট, দুটি মহার্ঘ প্লট, কোটি টাকার বেশি এফডিআর (FDR) এবং আভিজাত্যপূর্ণ ব্যক্তিগত গাড়ি—এই অঢেল সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও সাবেক ডিবি প্রধান হারুন অর রশীদের মতো বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে চরম সখ্য কাজে লাগিয়ে পার পেয়ে যান তিনি।

 

অভিযোগ রয়েছে, এই ক্ষমতার জোরেই নিজ স্ত্রীর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালান এবং জোরপূর্বক তাঁকে তালাক দিতে বাধ্য করেন।

আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি দাপ্তরিক শৃঙ্খলা ধূলিসাৎ করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের অভ্যাস। নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থাকায় সচিবালয় থেকে বারবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও তিনি তা তোয়াক্কা করেননি। একজন কর্মকর্তা উপপরিচালকের চলতি দায়িত্বে থেকেও সহকারী পরিচালকের হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার মতো নজিরবিহীন প্রশাসনিক জালিয়াতি চালিয়ে গেছেন বছরের পর বছর।

 

২০১৭ সালে দুর্নীতির অকাট্য প্রমাণের মুখে রাজশাহী থেকে তাঁকে প্রত্যাহার করা হলেও তৎকালীন রাজশাহী-২ আসনের এমপি ফজলে হোসেন বাদশা এবং সংস্কৃতিমন্ত্রী কে এম খালিদের প্রত্যক্ষ মদদে বেঁচে যান তিনি। শাস্তি পাওয়া দূরে থাক, উল্টো গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে নতুন করে ক্ষমতা পোক্ত করেন।

রাজনীতিকে ঢাল বানিয়ে সুবিধাবাদিতার চরম নিদর্শন রেখেছেন শামীম। ২০২১ সালে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মবার্ষিকীর প্রবন্ধ প্রতিযোগিতার সমন্বয়ক হয়ে বিজয়ীদের ৭০ শতাংশই বানাতেন নিজ আত্মীয় ও অনৈতিক সুবিধাভোগীদের। তাছাড়াও, এক নারীকে অনৈতিক প্রস্তাব ও জঘন্য হুমকির ১২ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের ফোনালাপ ফাঁস হয়ে তাঁর চরম নৈতিক স্খলনের চেহারা উন্মোচিত হয়েছিল।

সরকার পতনের পর এই সুবিধাবাদী কর্মকর্তা এবার নতুন রাজনৈতিক খোলস ধরেছেন। বিগত সরকারের সব সুবিধা চেটেপুটে খাওয়া শামীম এখন নিজেকে বিএনপি সমর্থক দাবি করে জোর লবিং চালাচ্ছেন। নিজের আসল বাড়ি সিরাজগঞ্জ হলেও বগুড়ার ভুয়া পরিচয় ঝুলিয়ে এবং শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নাম ভাঙিয়ে ফায়দা লোটার পাঁয়তারা করছেন।

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শামীম আকতার দাবি করেন, তিনি তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। তবে এর সপক্ষে কোনো দাপ্তরিক আদেশ বা প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি। পরবর্তীতে নিজেকে একটি অপরাধ বিষয়ক সাংবাদিক সংস্থার প্রধান পরিচয় দিয়ে শামীম আকতারের এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি মুঠোফোনে এই প্রতিবেদককে হুমকি দিয়ে বলেন, শামীম আকতার বগুড়ার লোক এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নিয়োজিত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করে তথ্যদাতাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করা উচিত।

২০১৩ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ নথিপত্রে দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এই বিতর্কিত কর্মকর্তা কীভাবে বহাল তবিয়তে থাকেন, তা নিয়ে শিল্পকলা একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সচেতন মহলের প্রশ্ন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এখনো কোনো অদৃশ্য প্রভাবে চুপ থাকবে, নাকি এই দুর্নীতির রাজপুত্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে?



ফেসবুকে আমরা