
নিজস্ব প্রতিবেদক
গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে সরকারি অর্থ আত্মসাত, অসম্পূর্ণ ও নিম্নমানের কাজের বিপরীতে বিল পরিশোধ, একই কাজ পুনরায় দরপত্রে দেখানো এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, অর্থবছরের জুন ক্লোজিংকে কেন্দ্র করে কাজ পুরোপুরি শেষ না হলেও বিভিন্ন প্রকল্পের বিল পরিশোধ করা হয়েছে। পাশাপাশি পছন্দের ঠিকাদারদের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে কাজ দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪ থেকে সরকারি বাসভবন ও বাসভবনসংলগ্ন বিভিন্ন কাজের জন্য একাধিক দরপত্র আহ্বান করা হয়। এর মধ্যে ১২৩৫৭০৬ নম্বর দরপত্রটির কাজের মূল্য ছিল প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। দরপত্রের আওতায় ছিল ঢাকার বেইলি রোডের সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের এশিয়ান, গুলফিশান ও কাহকাশান ভবনের ছাদ মেরামত, নিষ্কাশন ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাস্তা ও সীমানা প্রাচীর মেরামতসহ বিভিন্ন মেরামত কাজ।
অভিযোগ অনুযায়ী, সরেজমিনে এসব কাজের বাস্তব অবস্থা সন্তোষজনক নয় এবং বেশ কিছু কাজ নিম্নমানেরভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপরও কাজের সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে একই কাজকে ঘিরে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগের অন্যতম দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের গুলফিশান ভবনের ৭ নম্বর ফ্ল্যাটের মেরামত কাজ। ১২৩৫৭০৬ নম্বর দরপত্রের আওতায় বেইলি রোডের এশিয়ান, গুলফিশান ও কাহকাশান ভবনের মেরামতের কথা উল্লেখ থাকার পরও গুলফিশান কোয়ার্টারের ৭ নম্বর ফ্ল্যাটের জন্য পৃথক আরেকটি দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ দরপত্রের আইডি ১৩০৩৪৯১ এবং কাজের মূল্য প্রায় ১২ লাখ টাকা।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৩০৩৪৯১ নম্বর দরপত্রটি Limited Tendering Method বা LTM পদ্ধতিতে আহ্বান করা হয় এবং আগের অর্থবছরের বকেয়া কাজ হিসেবে দেখিয়ে নতুন অর্থবছরে এটি নেওয়া হয়েছে। গণপূর্তের কয়েকজন ঠিকাদারের অভিযোগ, একই ধরনের কাজের জন্য পৃথক দরপত্র আহ্বানের ফলে একই কাজের বিপরীতে পুনরায় বিল উত্তোলনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একই কাজকে দুই দফায় দরপত্রে দেখানোর মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, আগের কাজকেই নতুন করে সম্পন্ন হয়েছে দেখিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার বিল উত্তোলন করতে পারেন এবং পরবর্তীতে সেই অর্থ ভাগ-বাটোয়ারা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এদিকে ১২৩৬১৩০ নম্বর দরপত্র নিয়েও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ প্রকল্পের কাজ ছিল ইস্কাটন গার্ডেন সরকারি কর্মকর্তা কোয়ার্টারের সোনালী-রূপালী ক্যাম্পাসের সম্মুখভাগের জরাজীর্ণ সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণ। কাজটির মূল্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা।
অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ক্লোজিংয়ের সময় সম্পূর্ণ বিল পরিশোধ করা হয়েছে। সরেজমিনে সোনালী-রূপালী ক্যাম্পাসের সম্মুখভাগে গিয়ে দেখা গেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সীমানা প্রাচীরের কাজ আনুমানিক ৫০ শতাংশের মতো সম্পন্ন হয়েছে। এমনকি সম্পন্ন অংশের মধ্যেও কোথাও কোথাও পুরোনো সীমানা প্রাচীর রেখে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় পুরো বিল পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে গণপূর্তসংশ্লিষ্টদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হিসেবে অভিযোগে বলা হয়েছে, অর্থবছরের শেষ সময়ে কাজের বিল পরিশোধ না করলে বরাদ্দের অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত যেতে পারে। কিন্তু কাজ সম্পন্ন না হলেও কেবল অর্থ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কায় পুরো বিল দিয়ে দেওয়া হলে তা সরকারি আর্থিক বিধিবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সেটি তদন্তের বিষয়।
গণপূর্তসংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কাজ নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী অর্থ ফেরত যাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে কাজ সম্পন্ন হলে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অর্থ বরাদ্দের ব্যবস্থা করা সম্ভব। তাই কাজ অসম্পূর্ণ থাকা অবস্থায় পুরো বিল পরিশোধ করা হয়েছে কি না এবং হলে কোন নথির ভিত্তিতে তা করা হয়েছে—এ বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে।
এর বাইরে প্রধান প্রকৌশলীর কোনো প্রজ্ঞাপন বা নির্দেশনা অমান্য করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুদ রানা LTM-এর পরিবর্তে OTM পদ্ধতিতে প্রায় ৬৩টি দরপত্র আহ্বান করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এসব দরপত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতে মোটা অঙ্কের কমিশন নেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে উল্লিখিত দরপত্র আইডিগুলো হলো—১২৯৫৬৫১, ১২৭৪২০৫, ১২৯৫৬৪৪, ১২৮২৩৫০, ১২৮২২৫৩, ১২৮১১৭৪, ১২৮২১৩৩, ১২৮৪৫৮৯, ১২৮৪৩৯৭, ১২৮২৩৪৮, ১২৯৬২৬০, ১২৭৬৮২২, ১২৭৫২৬৯, ১২৮৩৩৭৭, ১২৭৫৬৩২, ১২৭৫৪৭৮, ১২৮৪৫৯৭, ১২৮৩৫৬৮, ১২৮৩৭২০, ১২৮৩৭৫১, ১২৭২৮৩৮, ১২৮৪২৯৮, ১২৭৫৪০২, ১২৭৫৫২৮, ১২৭৫৪২৯, ১২৭৫৬১২, ১২৭৫৫৭০, ১২৭৫৩৭১, ১২৭২৮১৮, ১২৭২৭৭৭, ১২৭২৮৩৩, ১২৭২৭৩, ১২৩৬৪১৯, ১২৪৪৯০৯, ১২৪৭৯৯৯, ১২৪৪৪৬১, ১২৩৬০৭৫, ১২৫২৭২৩, ১২৫২৩১০, ১২৪৮০২৩, ১২৩৫৭০৬, ১২৩৬২৩৯, ১২৫২৮৯৮, ১২৫২৭৫৪, ১২৫২৯২৯, ১২৪৭৯৮৯, ১২৪৮০০৪, ১২৫৮০১৮, ১২৪৮০১৯, ১২৪৭৭০৩, ১২৪৭৬৪৯, ১২৪৪৪৪৭, ১২১৯৫৯৮, ১২৪৫৭৪২, ১২১৭৬১৯, ১২১৯৫৭৯, ১২১৯৬১০, ১২১৯৫৭৯, ১২১৯৬০৩, ১১৮৩৮০৫, ১২০২৭২৪, ১২০২৭১৮, ১২০২৭২৫ এবং ১১৬৩৬২২।
অভিযোগকারী ঠিকাদারদের দাবি, এসব দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। তাদের আরও অভিযোগ, দরপত্র প্রক্রিয়ায় অনিয়মের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং এর বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি দরপত্রের টেন্ডার নোটিশ, পদ্ধতি নির্বাচন, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠান, দরদাতা, মূল্যায়ন প্রতিবেদন, কার্যাদেশ এবং বিলের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে ১২৩৫৭০৬ নম্বর দরপত্রটি একই সঙ্গে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ টাকার মূল কাজ এবং পরবর্তী সময়ে ১৩০৩৪৯১ নম্বর প্রায় ১২ লাখ টাকার কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় বিষয়টি আলাদাভাবে যাচাইয়ের দাবি রাখে। একইভাবে ১২৩৬১৩০ নম্বর দরপত্রের ক্ষেত্রে কাজের বাস্তব অগ্রগতি এবং পরিশোধিত বিলের পরিমাণ তুলনা করাও জরুরি।