
নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর মুগদা, মান্ডা এবং মানিকনগর এলাকায় তরুণীদের টোপ হিসেবে ব্যবহার করে অপরাধ চক্রের ব্ল্যাকমেইলিং বা ‘হানি ট্র্যাপ’ (Hani Trap)-এর ঘটনা আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে চলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার করে গড়ে ওঠা এই চক্রগুলোর ফাঁদে পড়ে প্রতিদিন অনেক সাধারণ মানুষ বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সামাজিক মর্যাদা হারাচ্ছেন। লোকলজ্জার ভয়ে অধিকাংশ ভুক্তভোগী বিষয়টি গোপন রাখায় এই অপরাধ দিন দিন আরও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে উঠছে।
অপরাধের অভিনব কৌশল
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রগুলো অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে কয়েকটি ধাপে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে:
ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপে ফাঁদ: চক্রের নারী সদস্যরা প্রথমে ফেসবুক, টিকটক বা হোয়াটসঅ্যাপে ছদ্মনামে অ্যাকাউন্ট খুলে টার্গেট করা ব্যক্তিকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। এরপর মেসেঞ্জারে মিষ্টি কথায় চ্যাটিং শুরু করে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে।
একান্তে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ: সম্পর্ক কিছুটা গভীর হলে কৌশলে ভুক্তভোগীকে মুগদা, মান্ডা বা মানিকনগর এলাকার কোনো নির্জন ফ্ল্যাট বা মেসে একান্তে দেখা করার জন্য ডাকা হয়।
অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও ও জিম্মি দশা: ভুক্তভোগী নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছানোমাত্রই আগে থেকে ওত পেতে থাকা চক্রের পুরুষ সদস্যরা (যারা নিজেদের কথিত ভাই, স্বামী বা সাংবাদিক/পুলিশ পরিচয় দেয়) ঘরে ঢুকে পড়ে। এরপর জোরপূর্বক মারধর করে ওই নারীর সাথে আপত্তিকর ছবি বা ভিডিও ধারণ করা হয়।
মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ ও ব্ল্যাকমেইল: ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়া বা মামলার ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। অনেক সময় এটিএম কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তাৎক্ষণিকভাবে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতেও নিয়মিত টাকা দিতে বাধ্য করা হয়।
মুগদা-মান্ডা-মানিকনগর কেন হটস্পট?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই এলাকাগুলোতে ঘনবসতি বেশি এবং বিপুল সংখ্যক সাবলেট বা মেস বাসা রয়েছে। প্রতিনিয়ত নতুন মানুষ আসার কারণে অপরাধীরা সহজেই বাসা ভাড়া নিয়ে কয়েক মাস পর পর আস্তানা পরিবর্তন করতে পারে। ফলে স্থানীয়দের পক্ষেও অপরাধীদের চিহ্নিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ভুক্তভোগীদের নীরবতা ও অপরাধীদের সাহস
ভুক্তভোগীদের বড় অংশই ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী বা শিক্ষার্থী। পরিবার ও সমাজের কাছে ইজ্জত হারানোর ভয়ে তারা পুলিশের দ্বারস্থ হতে চান না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুগদা এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, “সামান্য পরিচয়ের সূত্র ধরে দেখা করতে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাকে আটকে রেখে মারধর করে ১ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়েছে এবং আরও টাকা না দিলে ভিডিও ফেসবুকে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। মান-সম্মানের ভয়ে কাউকে বলতে পারছি না।” ভুক্তভোগীদের এই নীরবতাই চক্রগুলোকে আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
পুলিশের বক্তব্য ও সচেতনতার বার্তা
এই বিষয়ে ডিএমপির সংশ্লিষ্ট জোনের এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান,
“হানি ট্র্যাপ চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে আমরা বিভিন্ন সময় গ্রেপ্তার করেছি। তবে এই অপরাধ দমনে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যক্তিগত সচেতনতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরিচিত কারো সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে এবং কোনো লোভ বা প্রলোভনে পড়ে অপরিচিত জায়গায় যাওয়া যাবে না।”
পুলিশ প্রশাসন আরও জানায়, কেউ এমন পরিস্থিতির শিকার হলে ভয় না পেয়ে নিকটস্থ থানা বা হ্যালো সিটি (Hello CT) অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ জানালে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ভুক্তভোগীর পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে।
সচেতনতাই একমাত্র প্রতিকার:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের এই যুগে অপরিচিত কোনো আইডি থেকে আসা অতি-আগ্রহী বার্তা এড়িয়ে চলাই এই ধরনের ফাঁদ থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায়।