
অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
উন্মুক্ত টেন্ডার ছাড়াই কাজ শুরু, ৮০% শেষের পর দরপত্র—তদন্তে মোস্তাক আহমেদ ও রাহাত মুসলেমীনের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)-এর চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন, বহুল আলোচিত ‘চেয়ারম্যান বাংলো’ সংস্কারকে ঘিরে উঠে এসেছে ভয়াবহ অনিয়ম, অস্বচ্ছতা এবং ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধির চিত্র। মাত্র ৩০ লাখ টাকার একটি সংস্কার প্রকল্প শেষ পর্যন্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা—যা সরকারি প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই অনিয়মের কেন্দ্রে রয়েছেন রাজউকের প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ এবং তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলেমীন। তদন্ত কমিটি তাদের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে এবং বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে।
প্রাক্কলন ৩০ লাখ, ব্যয় ২.১৬ কোটি—কীভাবে?
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু বাস্তবায়ন শেষে সেই ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ২ কোটি ১৬ লাখ টাকায়। এই অস্বাভাবিক ব্যয়বৃদ্ধি পরিকল্পনা, অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের গলদের ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
দরপত্রে ‘প্রহসন’: কাজ শেষে টেন্ডার!
তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ—উন্মুক্ত দরপত্র ছাড়াই ২০২৫ সালের মার্চে কাজ শুরু করা হয়। অথচ সরকারি প্রকল্পে এটি বাধ্যতামূলক নিয়ম।
আরও বিস্ময়কর তথ্য হলো, কাজের প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নামমাত্র দরপত্র আহ্বান করা হয়। তদন্ত কমিটি এটিকে “নিয়ম লঙ্ঘন” এবং “প্রহসনমূলক দরপত্র” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স নিয়াজ ট্রেডার্স-কে বৈধতা দিতেই এই কাগুজে টেন্ডারের আয়োজন করা হয়।
কার নির্দেশে শুরু, কার অনুমোদনে ব্যয়?
তদন্তে মূল প্রশ্নগুলোই এখন সামনে—
কে টেন্ডার ছাড়াই কাজ শুরু করার অনুমতি দিলেন?
ব্যয় ৩০ লাখ থেকে ২.১৬ কোটিতে বাড়ানোর অনুমোদন কোথা থেকে এল?
কাজের তদারকি ও বিল যাচাই কীভাবে করা হলো?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই তদন্তে উঠে আসে মোস্তাক আহমেদ ও রাহাত মুসলেমীনের নাম।
দায়িত্বে গাফিলতি, নাকি পরিকল্পিত অনিয়ম?
প্রধান নগর স্থপতি হিসেবে মোস্তাক আহমেদের দায়িত্ব ছিল প্রকল্পের নকশা, ব্যয়ের যৌক্তিকতা এবং নীতিমালা অনুসরণ নিশ্চিত করা। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে রাহাত মুসলেমীনের দায়িত্ব ছিল কাজের অগ্রগতি, গুণগত মান ও বিল যাচাই করা।
কিন্তু তদন্তে দেখা গেছে—
কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের মধ্যে অসামঞ্জস্য
অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব
বাস্তব কাজের তুলনায় অতিরিক্ত ব্যয় দেখানোর অভিযোগ
বক্তব্যে অসঙ্গতি, নীরবতা আরও প্রশ্ন বাড়ায়
অভিযোগের বিষয়ে মোস্তাক আহমেদ দাবি করেছেন—তদন্তে তাদের বিরুদ্ধে কিছুই পাওয়া যায়নি। তবে তিনি কোনো নথি উপস্থাপন করতে পারেননি।
অন্যদিকে, রাহাত মুসলেমীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এই নীরবতা জনমনে নতুন করে সন্দেহ তৈরি করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাজ শেষ হওয়ার পর দরপত্র আহ্বান করা হলে পুরো প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়াই অর্থহীন হয়ে পড়ে। এতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ধ্বংস হয় এবং পূর্বনির্ধারিত ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার পথ তৈরি হয়।
রাজউকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে এমন অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং প্রশাসনিক সংস্কৃতির গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
এখন বড় প্রশ্ন—ব্যবস্থা হবে, নাকি ফাইলবন্দি?
তদন্ত কমিটি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে—অনেক প্রতিবেদনই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখে না।
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ—
পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নিরীক্ষা
প্রকল্প ব্যয়ের পুনর্মূল্যায়ন
সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ
বাধ্যতামূলক ই-টেন্ডার ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং
৩০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প কীভাবে ২ কোটি ১৬ লাখ টাকায় পৌঁছাল—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত। তবে তদন্তে উঠে আসা তথ্য বলছে, পুরো প্রক্রিয়ায় গুরুতর অনিয়ম ও অস্বচ্ছতা ছিল এবং সেই দায় এড়াতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এখন দেখার বিষয়—এই ঘটনা কি আরেকটি ‘কাগুজে তদন্তে’ শেষ হবে, নাকি সত্যিই হবে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা।