
উদ্ধারকারী জাহাজে নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ, অতিরিক্ত প্রাক্কলন ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অভিযোগ
জাহিদুল আলম:
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. মামুন আল ফয়সালের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, নিম্নমানের যন্ত্রপাতি গ্রহণ, অতিরিক্ত প্রাক্কলন (ওভার এস্টিমেট), ভুয়া বা প্রশ্নবিদ্ধ মেরামত বিল এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
বর্তমানে তিনি বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জের যান্ত্রিক ও নৌ-প্রকৌশল বিভাগ, নৌ-মেরামত কেন্দ্রে কর্মরত। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ চাকরিজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাব খাটিয়ে সরকারি অর্থের অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেছেন।
উদ্ধারকারী জাহাজে সরঞ্জাম কেলেঙ্কারির অভিযোগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে চাকরিতে যোগদানের পর মো. মামুন আল ফয়সাল বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধার ইউনিটের ‘প্রত্যয়’, ‘নির্ভীক’, ‘দুরন্ত’ ও ‘দুর্বার’ জাহাজে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, ওই সময়ে উদ্ধার ইউনিটের সরঞ্জাম সরবরাহকারী একটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশ করে নির্ধারিত মান ও তালিকা অনুযায়ী সরঞ্জাম গ্রহণ না করে নিম্নমানের এবং চাহিদার তুলনায় কম সংখ্যক মালামাল গ্রহণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে বিদেশে অবস্থানকালে সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ উঠেছে।
এমনকি নারায়ণগঞ্জের খানপুর স্টোরে মালামাল বুঝিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সরবরাহ করা মালামালের সঠিক তালিকা ও হিসাব সংরক্ষণে অনিয়মের কারণে সরকারি সম্পদের প্রকৃত হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
মেরামতের নামে অতিরিক্ত প্রাক্কলনের অভিযোগ
মামুন আল ফয়সাল বিআইডব্লিউটিএর এমএমই বিভাগ, বরিশাল নৌবহর এবং পরবর্তী সময়ে নারায়ণগঞ্জের নৌ-মেরামত কেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন জলযানের মেরামতকাজে অতিরিক্ত প্রাক্কলন করার মাধ্যমে সরকারি অর্থ অপচয় ও আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করেছেন—এমন অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক জাহাজে ভালো ও ব্যবহারযোগ্য যন্ত্রাংশ থাকা সত্ত্বেও সেগুলো বাদ দিয়ে নতুন মালামাল কেনার নামে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়। পরে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে নিম্নমানের বিদেশি, বিশেষ করে চীনা পণ্য স্থাপন করা হয়। এসব যন্ত্রাংশ অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেলে পুনরায় মেরামতের নামে নতুন করে প্রাক্কলন তৈরি করা হয়।
ফলে একই ধরনের কাজ বারবার দেখিয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে।
‘কাজ না করেই’ অর্থ ছাড়ের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারীর দাবি, তাঁর দায়িত্বকালে বিভিন্ন জাহাজের নামে লাখ লাখ টাকার আর্থিক অনুমোদন নেওয়া হলেও অনুমোদিত কাজের সবটুকু বাস্তবে সম্পন্ন হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে কাজের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখিয়ে বিল প্রস্তুত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জাহাজের স্টাফ, মাস্টার ও ড্রাইভারদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক সময় জাহাজের প্রয়োজনীয় ভালো মালামাল পরিবর্তনের নামে নতুন মালামাল কেনার প্রক্রিয়া দেখানো হয়। কিন্তু বাস্তবে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে জাহাজে পুনরায় সমস্যা দেখা দেয়। এরপর একই ধরনের মেরামত দেখিয়ে আবারও অর্থ বরাদ্দ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
ঠিকাদার সিন্ডিকেটের অভিযোগ
নির্দিষ্ট কয়েকজন ঠিকাদারকে বড় কাজ পাইয়ে দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে নগদ অর্থ বা চেকের মাধ্যমে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন আল ফয়সালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারীদের দাবি, বিশেষ পছন্দের ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করানোর ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বড় মেরামতকাজের ক্ষেত্রে ঠিকাদার নির্বাচন, প্রাক্কলন, কাজের পরিমাণ এবং বিল পরিশোধের বিষয়গুলো তদন্ত করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ
মামুন আল ফয়সাল চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে পড়াশোনা করেছেন। অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রজীবনে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চাকরিজীবনে ওই রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সময়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন।
তবে এ অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সুষ্ঠু তদন্তের দাবি
বিআইডব্লিউটিএর সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, উদ্ধারকারী জাহাজের সরঞ্জাম গ্রহণ, স্টোরে মালামাল জমা, মেরামতের প্রাক্কলন, কাজের পরিমাণ, বিল পরিশোধ এবং ঠিকাদারদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের নথি যাচাই করা হলে অভিযোগের সত্যতা স্পষ্ট হবে।
তাঁদের দাবি, প্রয়োজনে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট সময়ের সব ক্রয় ও মেরামতকাজের নথি, অনুমোদন, বিল-ভাউচার এবং স্টোর রেজিস্টার যাচাই করা উচিত।
অভিযোগ অস্বীকার প্রকৌশলীর
অভিযোগের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক) মো. মামুন আল ফয়সাল বলেন, “আমি প্রজেক্টের পিডির অধীনে ছিলাম। পিডির নির্দেশে সব কেনাকাটা হয়েছে। আমি আমার কাজটুকু করেছি।”
তবে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত হয়েছে কি না, সংশ্লিষ্ট ক্রয় ও মেরামতকাজের নথিপত্রে কী তথ্য রয়েছে এবং অভিযোগের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়ে কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ে বিআইডব্লিউটিএ, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় অথবা সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি তদন্তকারী সংস্থার মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।