
নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশ ও সাংবাদিকতা—দুই পেশারই মূল দায়িত্ব জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত করা
পুলিশের ভূমিকা, পেশাগত দায়িত্ব ও জবাবদিহি নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের মধ্যে সাংবাদিকদের সমালোচনা প্রসঙ্গে নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, সাংবাদিকরা মাদকের টাকার ভাগ না পেয়ে পুলিশকে অকার্যকর বলছেন—এমন বক্তব্যের যথার্থতা ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট বক্তব্যের সমালোচকদের মতে, কোনো নির্দিষ্ট সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া পুরো সাংবাদিক সমাজকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে আর্থিকভাবে জড়িত বলে ইঙ্গিত করা দায়িত্বশীল বক্তব্যের পরিচায়ক নয়।
পুলিশ বাহিনীতে অনিয়মের অভিযোগ থাকলে তার দায় কি পুরো বাহিনীর ওপর বর্তায়? নিশ্চয়ই নয়। একইভাবে, কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই পুরো সাংবাদিক সমাজকে দায়ী করা যুক্তিসংগত হতে পারে না। বরং উভয় ক্ষেত্রেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
সমালোচনার জবাব হোক তথ্য-প্রমাণে
পুলিশের প্রধান দায়িত্ব অপরাধ দমন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, সাংবাদিকতার অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো সত্য তুলে ধরা, অনিয়ম অনুসন্ধান করা এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো মানুষের সামনে প্রকাশ করা।
কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, অনিয়ম কিংবা অবহেলার অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সাংবাদিকতার স্বাভাবিক অংশ। এসব প্রশ্নের জবাব হওয়া উচিত তথ্য-প্রমাণ, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে।
সমালোচনার জবাবে সমালোচকের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তাঁকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ তোলা সমস্যার সমাধান নয়। বরং এতে মূল বিষয় থেকে দৃষ্টি সরে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ব্যক্তি নয়, অপরাধের দায় নির্ধারিত হোক প্রমাণের ভিত্তিতে
সাংবাদিক হোন কিংবা পুলিশ সদস্য—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। কোনো সাংবাদিক অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একইভাবে, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি কিংবা অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলে সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি।
অভিযোগের ক্ষেত্রে পেশাগত পরিচয়ের পরিবর্তে প্রমাণ, তদন্ত ও আইনের শাসনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো পেশাজীবী গোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অনুচিত, তেমনি পেশাগত পরিচয়ের আড়ালে কোনো ব্যক্তিকে জবাবদিহির বাইরে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়।
জনগণের আস্থা অর্জনই হোক মূল লক্ষ্য
পুলিশ বাহিনী কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। একইভাবে, সাংবাদিকতাও কোনো প্রতিষ্ঠানের চাটুকারিতা করার পেশা নয়। উভয় পেশারই নিজস্ব দায়িত্ব, নৈতিকতা ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকা অপরিহার্য। তাই সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে তা থেকে প্রয়োজনীয় প্রশ্নগুলো চিহ্নিত করা এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
সর্বোপরি, সম্মান ও আস্থা জোর করে আদায় করা যায় না; তা অর্জন করতে হয় দায়িত্বশীল আচরণ, পেশাগত সততা এবং কাজের মাধ্যমে। অভিযোগ তোলার আগে যেমন প্রমাণ প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন যুক্তি ও তথ্য।
পদমর্যাদা নয়, দায়িত্ব পালনের স্বচ্ছতা ও সততাই হোক জনগণের আস্থা অর্জনের প্রধান ভিত্তি।