
বিশেষ অনুসন্ধান | নিজস্ব প্রতিবেদক
দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প পদ্মা সেতু রেল সংযোগে সরকারি অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন। সরকারি বিশেষ নিরীক্ষায় প্রকল্পটির ২০টি আপত্তিতে ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। কোথাও কাজের পরিমাণ কমলেও পরিশোধ করা হয়েছে পুরো বিল, কোথাও চুক্তির শর্তের বাইরে ব্যয় বাড়ানো হয়েছে, আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত মালামাল আমদানি ও উচ্চমূল্যে চুক্তির অভিযোগ উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অডিটে এত বিপুল অঙ্কের আপত্তি ওঠার পরও কত টাকা প্রকৃতপক্ষে অতিরিক্ত পরিশোধ হয়েছে, কত টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত এসেছে এবং দায়ী কারা—তার পূর্ণাঙ্গ ও জনসম্মুখে জবাবদিহি কোথায়?
অবশ্য অডিট আপত্তি উঠলেই অর্থ আত্মসাৎ বা অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। সংশ্লিষ্ট প্রকল্প কর্তৃপক্ষ আপত্তিগুলোর জবাব দিচ্ছে এবং কিছু আপত্তি নিষ্পত্তি বা প্রত্যাহার হয়েছে বলে দাবি করেছে। চূড়ান্ত দায় নির্ধারণের জন্য অডিট নিষ্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ২,১৩০ কোটি টাকার বিল নিয়ে
সরকারি নিরীক্ষার সবচেয়ে বড় আপত্তিগুলোর একটি ঢাকা-যশোর রেললাইন নির্মাণকাজ নিয়ে। অডিটের দাবি, মূল নকশায় রেললাইনের বাঁধের গড় উচ্চতা ৭ দশমিক ৩ মিটার থাকলেও পরবর্তী জরিপে তা কমিয়ে ৫ দশমিক ৬ মিটার করা হয়।
অর্থাৎ নকশা পরিবর্তনের পর কাজের পরিমাণ কমে যায়। মাটি ভরাট, পিভিডি, জিওটেক্সটাইল, সিমেন্ট মিক্সিং পাইল, ব্রিজ ও কালভার্টসহ বিভিন্ন কাজের পরিমাণও কম হওয়ার কথা।
কিন্তু অডিটের অভিযোগ, কাজ কমলেও ঠিকাদারকে বিল অব কোয়ান্টিটিজ বা বিওকিউ অনুযায়ী শতভাগ বিল দেওয়া হয়। এতে ১৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪৪ হাজার ডলার, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ হাজার ১৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা, অতিরিক্ত পরিশোধের অভিযোগ তুলেছে নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষ।
প্রশ্ন উঠেছে—নকশা পরিবর্তনের পর কাজের পরিমাণ যখন কমেছে, তখন কম কাজের বিপরীতে পুরো বিল কীভাবে পরিশোধ হলো?
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অডিটের ভাষ্য অনুযায়ী চুক্তির শর্তে অতিরিক্ত পরিশোধ পরবর্তী বিল থেকে সমন্বয় করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেই অর্থ সমন্বয় বা আদায়ের উদ্যোগ কেন নেওয়া হয়নি—সেটিও এখন তদন্তের বিষয়।
৩,৬০৬ কোটি টাকার উচ্চমূল্যের চুক্তি?
অডিটে আরও বড় একটি আপত্তি উঠেছে প্রকল্পকে ‘বিশেষায়িত কাজ’ হিসেবে দেখিয়ে প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি দামে চুক্তি করার বিষয়ে।
নিরীক্ষা কর্তৃপক্ষের হিসাবে এতে ৩ হাজার ৬০৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
একটি সরকারি প্রকল্পে প্রাক্কলনের তুলনায় এত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় কীভাবে অনুমোদিত হলো—এ প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষায়িত কাজ হিসেবে শ্রেণিবিন্যাসের ভিত্তি কী ছিল, বাজারদর যাচাই করা হয়েছিল কি না এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে কারা যুক্ত ছিলেন—এসব বিষয়ও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
কাজের চেয়ে বেশি বিল—১,০১১ কোটি টাকার অভিযোগ
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অগ্রগতি প্রতিবেদনের সঙ্গে প্রকল্পের বিলের তুলনা করেও অডিট আপত্তি তুলেছে।
নিরীক্ষার দাবি, অগ্রগতি প্রতিবেদনের তুলনায় বেশি কাজ দেখিয়ে ১ হাজার ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রশ্ন হলো—কাজের পরিমাণ নির্ধারণের দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের যাচাই প্রক্রিয়ায় এত বড় পার্থক্য কীভাবে তৈরি হলো?
চুক্তির বাইরে ব্যয়, বিওকিউ বাড়িয়ে ৭২৮ কোটি
অডিট প্রতিবেদনে টার্নকি বা ইপিসি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে বিওকিউ বাড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। এতে ৭২৮ কোটি ৪ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে।
ইপিসি চুক্তির মূল উদ্দেশ্যই হলো নির্ধারিত শর্ত ও কাঠামোর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন। সে ক্ষেত্রে চুক্তির বাইরে গিয়ে বড় অঙ্কের ব্যয় বাড়ানোর অনুমোদন কীভাবে দেওয়া হলো—তা যাচাইয়ের দাবি রাখে।
অতিরিক্ত রেল আমদানিতেও প্রশ্ন
প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ২ হাজার ৮৫৫ টন ইউআইসি-৬০ রেল আমদানির অভিযোগ উঠেছে। অডিট বলছে, এর ফলে শুল্ক, ভ্যাট ও অন্যান্য কর বাবদ ১২ কোটি ৫১ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে
প্রকল্প কর্তৃপক্ষ অবশ্য জানিয়েছে, কাজের পরিধি বাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত রেলের প্রয়োজন হয়েছিল।
অর্থাৎ এখানে মূল প্রশ্ন—অতিরিক্ত মালামাল আমদানির প্রয়োজনটি কি প্রকল্পের অনুমোদিত নকশা ও কাজের পরিধির ভিত্তিতে যথাযথভাবে নির্ধারিত হয়েছিল, নাকি পরে ব্যয়ের দায় তৈরি হয়েছে?
ডলারে দেশীয় পণ্যের মূল্য—৫১৯ কোটি টাকার আপত্তি
অডিটের আরেকটি আপত্তি দেশীয় মালামালের মূল্য বাংলাদেশি টাকার পরিবর্তে ডলারে পরিশোধের বিষয়ে।
এতে ৫১৯ কোটি ৯১ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকারি প্রকল্পে দেশীয় পণ্যের মূল্য পরিশোধের ক্ষেত্রে মুদ্রা নির্বাচন ও বিনিময় হারের প্রভাব সরাসরি সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ সিদ্ধান্তের পেছনে চুক্তিগত ভিত্তি ও অনুমোদনের বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি।
ভাঙ্গা স্টেশন, জমি, গাড়ি—বিভিন্ন খাতেও কোটি কোটি টাকার আপত্তি
অডিটে ভাঙ্গা রেলস্টেশনের নকশা পরিবর্তনে ২৮৫ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া গাড়ি কেনায় ১১০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, একই জমির মূল্য দ্বিতীয়বার নির্ধারণ করে অতিরিক্ত অনুদানে ১৭১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং অতিরিক্ত অর্থ ডিএসসিসিকে দিয়ে এফডিআরে রাখার ঘটনায় ৪১৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে।
এ ছাড়া কম গ্রানুলার স্যান্ড ব্যবহার করে ২১৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, কম ব্যালাস্ট পুরুত্বে ২৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা, ভাঙ্গা জংশনে অতিরিক্ত মাটি ভরাটে ৭ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং আরও কয়েকটি খাতে কোটি কোটি টাকার আপত্তি রয়েছে।
‘অডিট আপত্তি মানেই অনিয়ম নয়’
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের বর্তমান প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ১৩ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তির বিষয়ে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ একে একে জবাব দিচ্ছে। অডিট আপত্তি উঠলেই সেটিকে অনিয়ম বলা যায় না। উত্থাপিত বিষয়গুলোর নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া চলছে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনও জানিয়েছেন, অডিটের অধিকাংশ আপত্তি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং অনেক আপত্তি প্রত্যাহার করা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্যের জন্য প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
একই কর্মকর্তাকে ঘিরে একাধিক অভিযোগ
পদ্মা রেল প্রকল্পের অডিট আপত্তির পাশাপাশি রেলের নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ কেনায় ৬৫৮ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ নিয়েও তদন্ত চলছে। এ বিষয়ে রেল মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
অন্যদিকে দুদকের চলমান অনুসন্ধানে পাথর সরবরাহ ও মোটর মেরামতের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে অর্থ রাখার অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে বিএফআইইউর সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; কোনো ব্যক্তি আদালতের চূড়ান্ত রায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন—এমন তথ্য প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে না।
পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন
অডিটে বড় অঙ্কের আর্থিক আপত্তি ওঠার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত ও অডিট নিষ্পত্তি চলমান থাকা অবস্থায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেওয়া হয়েছে, সেটিও জনস্বার্থে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ—টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, এত বড় প্রকল্পে ওঠা অভিযোগ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, প্রকল্প কর্তৃপক্ষ কিংবা ঠিকাদার—যেই দায়ী হোক, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
এখন সামনে তিনটি বড় প্রশ্ন
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের অডিট আপত্তির পর এখন জনস্বার্থে অন্তত তিনটি প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন—
প্রথমত, ১৩ হাজার ৩৬১ কোটি ৫২ লাখ টাকার মধ্যে কোন কোন আপত্তি ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কত টাকা প্রকৃতপক্ষে আদায় বা সমন্বয় করা হয়েছে?
দ্বিতীয়ত, অডিটে যেসব কম কাজ, অতিরিক্ত বিল ও চুক্তির বাইরে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর জন্য দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, পরামর্শক ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী ছিল?
তৃতীয়ত, সরকারি অর্থের ক্ষতি প্রমাণিত হলে সেই অর্থ ফেরত আনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ বলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। তাঁর ভাষায়, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নন।
পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার একটি ঐতিহাসিক বিনিয়োগ। তাই এই প্রকল্পে সরকারি অর্থের প্রতিটি টাকার হিসাব, অডিট আপত্তির স্বচ্ছ নিষ্পত্তি এবং দায় নির্ধারণ শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়—এটি জনস্বার্থ ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির প্রশ্ন।