
২ কোটি টাকার প্রকল্পে সিডিউল না মানার অভিযোগ • ‘১২ টেবিলের হিসাব’ মন্তব্যে প্রশ্ন • তথ্য দিতে অনীহা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা
রাজধানীর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন একটি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) অর্থায়নে নিমতলী এলাকায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ কাজে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। একই সঙ্গে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সিডিউল অনুযায়ী না হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য দিতে অনীহার কারণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও সরেজমিন পরিদর্শনে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিমতলী নতুন রাস্তার কেরাম বোর্ড গলিতে ড্রেন ও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকে প্যাকেজ আকারে প্রায় ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
প্রকল্পটির আওতায় রাস্তা পাকা করণ এবং দুই পাশের ড্রেন নির্মাণের কাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় মেসার্স মাসুদ ট্রেডার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে।
সরেজমিনে যা দেখা গেল
প্রতিবেদকের সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশের ড্রেন নির্মাণে নিম্নমানের ও ভাঙাচোরা ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের সিডিউল অনুযায়ী নির্ধারিত মানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে না।
এলাকার বাসিন্দারা জানান, এই ধরনের নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করা হলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাস্তা ও ড্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সরকারের বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও জনগণ টেকসই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে।
সাব–কন্ট্রাকটরের মন্তব্যে বিতর্ক
কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সেখানে দায়িত্বরত সাব–কন্ট্রাকটর লিটন বলেন, দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন স্তরে অনুমোদন ও প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে একাধিক ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
তিনি বলেন, “দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ১২টি টেবিল শেষ করে আমাদের কাজ করতে হয়।”
তিনি আরও দাবি করেন, তারা প্রায় ১ কোটি টাকার কাজ বাস্তবায়ন করছেন। তবে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
তথ্য দিতে অনীহা প্রকৌশলীরা
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে দায়িত্বরত সাব–অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার মল্লিক বলেন,
“প্রকৌশলী স্যারের অনুমতি ছাড়া আমি কোনো তথ্য দিতে পারবো না।”
অন্যদিকে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. মফিজুর রহমান খান-এর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
সংবাদ প্রকাশের পর চাপের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রের দাবি, নিমতলী এলাকায় রাস্তা নির্মাণে অনিয়মের বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মো. মফিজুর রহমান খান বিভিন্ন সাংবাদিকের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান বা ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।
তবে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
আইনি কাঠামো কী বলছে
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি অর্থায়নে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় আইন (Public Procurement Act, 2006) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা (PPR 2008) অনুযায়ী কাজের মান, উপকরণের গুণগত মান এবং তদারকি নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বা নিম্নমানের কাজ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।
তদন্তের দাবি স্থানীয়দের
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জনগণের করের টাকা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে তা দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তারা দাবি করেন, নিমতলী এলাকায় এডিবি অর্থায়িত এই প্রকল্পের কাজের গুণগত মান, ব্যয় এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্বচ্ছ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।