
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুর্নীতি দমন কমিশন – দুদক)-এ দাখিল করা একটি বিস্তৃত অভিযোগপত্রে দেশের প্রকৌশল বিভাগের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর চিত্র উঠে এসেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এহতেশামুল রাসেল খান। তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, বেআইনি পদোন্নতি গ্রহণ, ঠিকাদার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং দেশ-বিদেশে শত শত কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
পদোন্নতিতে অনিয়ম ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ
দুদকে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির বৈধ সুপারিশ ছাড়াই এবং জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা উপেক্ষা করে ২৬ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে রাসেল খানকে পদোন্নতি দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী তাজুল ইসলাম ও সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর প্রভাব ব্যবহার করে একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তোলেন। এর ফলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নীতিমালা উপেক্ষিত হয়।
একাধিক দায়িত্বে একক নিয়ন্ত্রণ, বাড়ে দুর্নীতির ঝুঁকি
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, রাসেল খান একই সঙ্গে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (পরিকল্পনা) এবং ফিজিবিলিটি স্টাডি সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর দায়িত্ব পালন করছেন। পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই—এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ধাপ এক ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকায় স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রকল্পের প্রাক্কলন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হয় এবং নির্ধারিত হারে কমিশন আদায় করা হয়। এমনকি কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল অগ্রসর না হওয়ার অভিযোগও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অবৈধ সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ
দুদকে দাখিল করা অভিযোগপত্রে রাসেল খানের বিপুল সম্পদের বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী তাঁর রয়েছে—
রাজধানীর উত্তরা ও পূর্বাচলে দামী প্লট
সাভার ও গাজীপুর এলাকায় বিস্তীর্ণ জমি ও খামারবাড়ি
পরিবার-পরিজনের নামে একাধিক বিলাসবহুল জাপানি গাড়ি
এসব সম্পদের সঙ্গে তাঁর ঘোষিত আয়ের অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—অবৈধভাবে অর্জিত অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই ও কানাডায় পাচার করা হয়েছে। সেখানে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের নামে বিলাসবহুল আবাসন ও ‘সেকেন্ড হোম’ কেনার তথ্যও অভিযোগপত্রে সংযুক্ত রয়েছে। আত্মীয়স্বজনের নামে সম্পদ রেজিস্ট্রির মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার অভিযোগও উঠেছে।
কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
অভিযোগকারী এনামুল কবির দুদকের কাছে লিখিত আবেদনে বলেন,
“এটি ব্যক্তিগত বিষয় নয়; রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন। নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ছাড়া প্রকৌশল বিভাগে দুর্নীতি বন্ধ হবে না।”
দুদক সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগটি প্রাথমিক যাচাই প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সম্পদের উৎস, ব্যাংক লেনদেন এবং বিদেশে অর্থপাচারের বিষয়ে আলাদা অনুসন্ধানের প্রস্তুতি চলছে।
প্রকৌশল বিভাগে ওঠা এই অভিযোগ এখন আর গোপন নয়—এটি দুদকের আনুষ্ঠানিক নথিতে স্থান পেয়েছে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, প্রভাবশালী মহলের চাপ উপেক্ষা করে দুদক স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করবে এবং প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এই অনুসন্ধান কেবল একজন কর্মকর্তার বিচার নয়, বরং পুরো প্রশাসনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।