নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারি চাকরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদ জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগকে ঘিরে কথিত ৬৯ কোটি টাকার আর্থিক চুক্তির অভিযোগে প্রশাসনজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে বিপুল অঙ্কের অর্থ পরিশোধে সম্মতির একটি কথিত চুক্তিপত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কন্ট্রোলার অব স্টোরস ও উপসচিব মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ। ফাঁস হওয়া কথিত নথিতে দাবি করা হয়েছে, ডিসি পদে পদায়ন নিশ্চিত করতে একটি সিন্ডিকেট প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয় করবে এবং পদায়নের পর ওই অর্থের দ্বিগুণসহ সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে মোট ৬৯ কোটি টাকা ১৮ মাসের মধ্যে পরিশোধের বিষয়ে সম্মতি দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, সরকারি পদায়নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এ ধরনের আর্থিক চুক্তির অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
কথিত নথিতে কী রয়েছে
২৯ মার্চ তারিখে স্বাক্ষরিত বলে দাবি করা কথিত সম্মতিপত্রে সালাহউদ্দিন আহমেদ নিজের পরিচয়, পদমর্যাদা ও ব্যাচ উল্লেখ করে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক হিসেবে পদায়নের বিষয়ে সম্মতির কথা লিখেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পটুয়াখালীর এক ব্যবসায়ীকে নিজের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কথাও নথিতে উল্লেখ আছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারি পদায়ন প্রক্রিয়ায় কোনো বেসরকারি ব্যক্তিকে এ ধরনের ভূমিকা দেওয়ার অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও সুশাসনের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হবে।
৪৫ কোটি টাকার তহবিল সংগ্রহের অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কাঙ্ক্ষিত পদায়ন নিশ্চিত করতে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহের চেষ্টাও করা হয়।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি এবং অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আইন ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সরকারি কর্মকর্তা যদি নিজের পদায়নকে প্রভাবিত করতে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন বা তদবিরের আশ্রয় নেন, তবে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা, শৃঙ্খলা বিধিমালা এবং দুর্নীতিবিরোধী আইনের আলোকে তদন্তযোগ্য বিষয় হতে পারে।
যা বললেন সালাহউদ্দিন আহমেদ
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ কথিত সম্মতিপত্রে স্বাক্ষরের বিষয়টি স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তার ভাষ্য, “কয়েকজন লোকের একটি সিন্ডিকেট এসব কাজ করে থাকে। আমিও ভালো কোনো জায়গায় পোস্টিং পাওয়ার চেষ্টা করেছি।”
তবে অভিযোগে উল্লেখিত বিপুল অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
প্রশাসনের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে তা শুধু একটি পদায়নকে ঘিরে অনিয়মের ঘটনা হবে না; বরং রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, নিয়োগব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে অভিযোগগুলো অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুনাম রক্ষার স্বার্থেও দ্রুত তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।